মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ যখন একের পর এক বাধার মুখে পড়ছে, তখন দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আকাশপথ আবার খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিবেশী ইরাক। ইরানি এয়ারলাইনগুলোর জন্য নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪০টি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে বাগদাদ। তবে এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মাহান এয়ারকে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শুক্রবার এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি এয়ারলাইনগুলোর বিমানকে সেবা দিতে বিভিন্ন গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান অনীহা দেখালে ইরান-ইরাকের বিমান যোগাযোগ বড় সংকটে পড়ে। নতুন এই সমঝোতাকে সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের বিমান চলাচল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর ইরানি বিমানকে সেবা দেওয়া নিয়ে ইরাকের বিমানবন্দর ও গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে ইরান থেকে ইরাকের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশেষ ছাড় চায়। ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের ইতিবাচক সহযোগিতার ফলে নাজাফ রুটে সীমিত পরিসরে ইরানি ফ্লাইট পুনরায় চালুর পথ তৈরি হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের আওতায় ইরানি এয়ারলাইনগুলো নাজাফ থেকে এবং নাজাফে দৈনিক সর্বোচ্চ ৪০টি ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে। অর্থাৎ এটি শুধু ইরান থেকে ইরাকে যাওয়ার ফ্লাইট নয়; দুই দিক মিলিয়ে মোট ৪০টি ফ্লাইটের অনুমতি।
ইরানের জন্য নাজাফ সাধারণ কোনো আন্তর্জাতিক বিমানগন্তব্য নয়। শহরটি শিয়া মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র এবং সেখানে ইমাম আলীর মাজার অবস্থিত। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ইরানি ধর্মীয় সফর, তীর্থযাত্রা ও অন্যান্য কাজে নাজাফে যান।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ কাজেম আল-সাদেকের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার আগে ইরান থেকে নাজাফে প্রতিদিন প্রায় ২৫টি এবং বাগদাদে প্রায় ১৫টি ফ্লাইট চলত। ইরানি এয়ারলাইনগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার মানুষ ইরান ও ইরাকের মধ্যে যাতায়াত করতেন।
তাই নাজাফ রুট পুনরায় সচল হওয়া শুধু বিমান যোগাযোগ স্বাভাবিক করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে ধর্মীয় পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগও জড়িত।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থা বিশেষ করে তীর্থযাত্রী, চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষ এবং পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। এর পর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে ইরানি বিমানের জন্য গ্রাউন্ড সেবা, জ্বালানি, যাত্রীসেবা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পর নাজাফ বিমানবন্দরও ইরান থেকে আসা এবং ইরানে যাওয়া সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করেছিল। সে সময় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ে ইরানেও ক্ষোভ তৈরি হয়। নাজাফে ইরানি ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় বিমানবন্দরের বাইরে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়। কারণ নাজাফ ইরানি তীর্থযাত্রীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড়ের পর একই রুটে আবার প্রতিদিন ৪০টি ফ্লাইটের অনুমতি দেওয়ার ঘটনা ইরানের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। তবে প্রতিদিন ৪০টি ফ্লাইটের অনুমতি মানেই বাস্তবে প্রতিদিন ৪০টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে এমন নয়। বিমান সংস্থাগুলোর সময়সূচি, বিমান ও ক্রু সক্ষমতা, গ্রাউন্ড সেবা এবং সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার শর্তের ওপর প্রকৃত ফ্লাইট সংখ্যা নির্ভর করবে।
এই সিদ্ধান্তের আরেকটি দিক হলো ইরাকের কূটনৈতিক অবস্থান। একদিকে ইরানের সঙ্গে ইরাকের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে নাজাফ রুট চালুর জন্য ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা ইরাকের জন্য একটি ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ। ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও বলেছে, এই সমঝোতা দেখায় যে আলোচনার মাধ্যমে মানবিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
নাজাফ রুটে নতুন এই অনুমতি ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে একই সময়ে দেশটির অন্যান্য আন্তর্জাতিক রুটে নিষেধাজ্ঞা ও বিমানবন্দর-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ অব্যাহত রয়েছে।
ইরান যুদ্ধ কি নতুন করে তীব্র হতে যাচ্ছে?
ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় সৌদি জোটের ৯৪ হামলার দাবি হুতিদের
একাদশের ক্লাস শুরুর ৮ দিন পর প্রকাশ হলো তিন বিষয়ের সিলেবাস
তুরস্কে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও ইরানি এয়ারলাইনের ৮৩ ফ্লাইট