হুথিদের থামানো না গেলে ইয়েমেনে মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ হবে: জাতিসংঘ দূত

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫০ এএম

ইয়েমেনে হুথি বাহিনী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াইয়ের কারণে দেশটির মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। হুথিদের সামরিক অভিযান ও হামলা বন্ধ করা না গেলে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট ও বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর ইয়েমেনে ২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি যেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৬ হাজার, সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়ে ২ লাখ ছাড়িয়েছে।

২০২২ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াই

ইয়েমেনে কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে কম মাত্রার সংঘাত চলার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি আবার বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সতর্ক করেছিলেন, দেশটি ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় মাত্রার সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে। পরে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়।

তীব্র লড়াইয়ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে তায়েজ, মোখা, হোদেইদা ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে এলাকা। হুথিরা মোখাসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে অগ্রসর হওয়ার পর সৌদি-সমর্থিত বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। সাম্প্রতিক অভিযানে সৌদি বিমান হামলাও জোরদার হয়েছে।

দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত

IOM-এর হিসাবে, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ২ লাখের বেশি ইয়েমেনি ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় অংশের আশ্রয় হয়েছে আদেন ও তায়েজসহ বিভিন্ন এলাকায়, যেখানে আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছেন।

জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানিয়েছে, কিছু এলাকায় প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে প্রায় তিনটি পরিবার খাদ্যসংকটে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বন্দর, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে সংঘাতের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় পড়ছে।

তায়েজ ও হোদেইদায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন

সংঘাতের কারণে তায়েজ ও হোদেইদার কিছু এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের জেনেভা ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে, সংঘাতের কারণে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কাছে WFP ও এর অংশীদাররা নিয়মিত সহায়তা পৌঁছাতে পারছে না।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা দিতে গিয়ে তাদের ভবিষ্যতের জন্য মজুত রাখা খাদ্য ব্যবহার করতে হচ্ছে। নতুন অর্থায়ন না এলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খাদ্য ও অর্থ—দুটিরই ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

সৌদি বিমান হামলা, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা

সংঘাতের সাম্প্রতিক পর্যায়ে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল পুনর্দখলের জন্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। এ অভিযানে সৌদি বিমানবাহিনীর শতাধিক যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। ৭ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদ ও আবহা বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় তিনজন নিহত ও কয়েক ডজন মানুষ আহত হওয়ার খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে সংঘাত শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকছে না; সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বাণিজ্যপথও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বাব আল-মান্দাব নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালি। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলাচল করে।

হুথিদের উপকূলীয় অঞ্চলে অগ্রসর হওয়ার ফলে প্রণালিটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূতও এর আগে সতর্ক করেছিলেন, ইয়েমেনে নতুন করে বড় সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব শুধু দেশটির মানুষের ওপর নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পড়তে পারে।

জাতিসংঘের আহ্বান: যুদ্ধ নয়, আলোচনায় ফিরতে হবে

জাতিসংঘের বিশেষ দূত গ্রুন্ডবার্গ ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত যুদ্ধের দিকে যেতে না দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে তিনি হুথি আলোচকদের সঙ্গেও বৈঠক করেন এবং সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চেষ্টা করেন।

জাতিসংঘের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশও হুথিদের হামলা বন্ধ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বলেছে, হুথিদের হামলা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা জরুরি।

সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ

ইয়েমেন বহু বছর ধরেই বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে রয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, খাদ্যের দাম বাড়ছে, ত্রাণ পৌঁছানোর পথ বন্ধ হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত অব্যাহত থাকলে ইয়েমেনে খাদ্যনিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি আরও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে। ফলে সামরিক বিজয়ের পরিবর্তে অবিলম্বে সহিংসতা কমানো, মানবিক সহায়তার পথ খুলে দেওয়া এবং রাজনৈতিক আলোচনায় ফেরাই ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এমইউ
আরও পড়ুন