মার্কিন নৌবাহিনীতে বড় পরিবর্তনের নেপথ্যে রহস্যময় এক নাবিক, খুঁজে পাচ্ছে না পেন্টাগনও

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম

মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরিতে পুরোনো প্রযুক্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন এক রহস্যময় নাবিক। ‘বিল জোন্স’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তির পরামর্শে প্রভাবিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নৌবাহিনীকে আধুনিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার বদলে পুরোনো বাষ্পচালিত বিমান উৎক্ষেপণব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করতে বলেছেন। কিন্তু এত বড় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলা ওই নাবিকের প্রকৃত পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি মার্কিন নৌবাহিনী।

১২ অক্টোবর দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের নির্দেশের পর প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ওই নাবিককে শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন। বর্তমান ও সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা, আইনপ্রণেতা, হোয়াইট হাউসের সহযোগী এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। 

কীভাবে শুরু হয়েছিল ঘটনা?

ঘটনার সূত্রপাত ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। তখন তিনি ভার্জিনিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড পরিদর্শন করেন। জাহাজটি তখন মার্কিন নৌবহরের সবচেয়ে আধুনিক ও বৃহৎ বিমানবাহী রণতরি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে নির্মাণে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তি নিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল এটি।

ট্রাম্প পরে একাধিকবার বলেছেন, জাহাজের যন্ত্রপাতি পরিচালনাকারী কর্মীদের কাছ থেকে সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন, বিমান উৎক্ষেপণের জন্য কোন ব্যবস্থা বেশি কার্যকর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তখন একজন নাবিক তাঁকে বোঝান যে প্রচলিত বাষ্পচালিত ক্যাটাপল্ট বাদ দিয়ে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে।

ট্রাম্পের ভাষ্য, ওই নাবিকের যুক্তি তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। এরপর বিষয়টি কয়েক বছর আলোচনার বাইরে থাকলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে তিনি আবার ‘বিল জোন্স’-এর প্রসঙ্গ তোলেন। ২০২৫ সালেও বৈদ্যুতিক ক্যাটাপল্টের পরিবর্তে বাষ্পচালিত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের আগস্টে বিষয়টি আনুষ্ঠানিক নির্দেশনায় রূপ নেয়। 

আধুনিক প্রযুক্তির বদলে পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরার নির্দেশ

১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক স্মারকলিপিতে ট্রাম্প প্রশাসন বিমানবাহী রণতরিতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক এয়ারক্রাফট লঞ্চ সিস্টেম (EMALS) এবং উন্নত অস্ত্র উত্তোলনব্যবস্থার পরিবর্তে বাষ্পচালিত ক্যাটাপল্ট ও হাইড্রোলিক ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা চেয়েছে।

নির্দেশনায় বিশেষভাবে সিভিএন-৮১ (CVN-81) নামের ভবিষ্যৎ ফোর্ড-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরির কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৬০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, সময়সীমা ও অর্থায়নের পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়। 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্দেশটি নতুন জাহাজে পুরোনো প্রযুক্তি ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা তৈরির জন্য। এর অর্থ এই নয় যে ইতিমধ্যে পুরো নৌবহর থেকে আধুনিক ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বাষ্পচালিত ক্যাটাপল্ট আর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার পার্থক্য কী?

বিমানবাহী রণতরির ডেক থেকে যুদ্ধবিমানকে অল্প দূরত্বে দ্রুতগতিতে আকাশে তুলে দিতে ক্যাটাপল্ট ব্যবহৃত হয়। প্রচলিত বাষ্পচালিত ক্যাটাপল্ট উচ্চচাপের বাষ্পের শক্তি কাজে লাগিয়ে বিমানকে সামনে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে, EMALS বৈদ্যুতিক ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক শক্তির সাহায্যে বিমান উৎক্ষেপণ করে।

বাষ্পচালিত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হওয়ায় এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে নৌবাহিনীর অভিজ্ঞতা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, পরীক্ষিত প্রযুক্তিতে ফিরে গেলে জাহাজ নির্মাণ সহজ হতে পারে এবং জটিলতা ও বিলম্ব কমানো সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনী ফোর্ড-শ্রেণির রণতরিতে আধুনিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাকে কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। নতুন ব্যবস্থাটি বিমান উৎক্ষেপণে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ফলে পুরোনো প্রযুক্তিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যয়, কর্মদক্ষতা ও বাস্তবায়নের প্রশ্ন রয়েছে। 

পরিবর্তনে ব্যয় বাড়বে, বিলম্বও হতে পারে

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ফোর্ড-শ্রেণির রণতরির নকশায় বড় পরিবর্তন আনতে বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে এবং নির্মাণকাজে আরও বিলম্ব ঘটতে পারে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ক্ষেপণের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

স্মারকলিপিতে ট্রাম্প প্রশাসন জাহাজ নির্মাণে অতিরিক্ত জটিল নকশা, বারবার পরিবর্তন এবং শিল্পভিত্তির সীমাবদ্ধতাকে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রশাসনের লক্ষ্য পরীক্ষিত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। তবে বাষ্পচালিত ব্যবস্থায় ফেরার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কত ব্যয়বহুল হবে, তা নির্ভর করবে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর। 

কে এই বিল জোন্স?

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য নাবিকটির পরিচয়। ট্রাম্প তাঁকে ২৫ বছর নৌবাহিনীতে কাজ করা একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘বিল জোন্স’ তাঁর প্রকৃত নাম কি না, কিংবা তিনি ঠিক কোন জাহাজে ও কোন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

নৌবাহিনীর একজন মুখপাত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, জন্মতারিখ বা অন্য কোনো শনাক্তকারী তথ্য ছাড়া নৌবাহিনীর নথিতে ওই নাবিককে নির্ভুলভাবে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়।

এ কারণেই মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা ব্যক্তিকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। একজন নাবিকের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কথোপকথন কতটা বড় নীতিগত পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সব মিলিয়ে, বিল জোন্সের পরিচয় অজানা থাকলেও তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের কথোপকথনের বর্ণনা এখন মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরির প্রযুক্তি ও নির্মাণনীতি নিয়ে বড় বিতর্কের অংশ। তবে পুরোনো প্রযুক্তিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বাস্তব সুফল, ব্যয় এবং সময়সীমা নির্ধারিত হবে আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ও পরবর্তী বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত