যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের অরোরা এলাকায় একটি হিন্দু মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আলেক্সান্দ্রোস পাপোরাকিস নামের ওই তরুণের কাছ থেকে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শসংবলিত একটি নথি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার কথাও উল্লেখ ছিল।
পুলিশের অভিযোগ, ওই তরুণ একটি গণহত্যামূলক বন্দুক হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তবে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তাঁর হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থল এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ইলিনয়ের অরোরা এলাকার একটি হিন্দু উপাসনালয় তাঁর সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রোলিং মেডোজের কুক কাউন্টির তৃতীয় মিউনিসিপ্যাল ডিস্ট্রিক্ট আদালতে তাঁকে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক তাঁকে হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। আগামী ৩০ অক্টোবর তাঁর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
যেভাবে সামনে আসে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ
পালাটাইন এলাকার বাসিন্দা পাপোরাকিস একটি টাকো বেল রেস্তোরাঁয় ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। অন্য এক ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে গণহারে গুলি চালানোর পরিকল্পনার অভিযোগ জানানোর পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাপোরাকিস ওই ব্যক্তির সঙ্গে একটি নথি ও কিছু ছবি শেয়ার করেছিলেন। নথিতে গণহারে গুলি চালানোর পরিকল্পনার কথা ছিল বলে অভিযোগ। ছবিগুলোতে রাইফেল, রাইফেলের ম্যাগাজিন, বডি আর্মার এবং বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত সরঞ্জাম দেখা যায়।
পুলিশ জানায়, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ধারণা, ১১ অক্টোবর রোববার হামলাটি চালানোর পরিকল্পনা থাকতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল অরোরা এলাকার কোনো হিন্দু উপাসনালয়। তবে ঠিক কোন স্থানে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা এখনো তদন্তাধীন।
তদন্তকারীদের দাবি, পাপোরাকিস তাঁর কর্মস্থলের সহকর্মীদের বলেছিলেন, রোববার একটি বিশেষ দিন হতে যাচ্ছে। ওই দিন সকালে এক সহকর্মীকে ফোন করে তিনি জানান, তাঁর বন্দুক আটকে গেছে এবং তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে গেছেন, যাতে কেউ তাঁকে দেখতে না পায়।
পালাটাইন পুলিশের প্রধান উইলিয়াম নর্ড বলেন, অভিযোগে উঠে আসা হুমকির গুরুত্ব কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অগ্রাধিকার।
বাসা থেকে রাইফেল ও বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধার
পুলিশের গোয়েন্দারা পাপোরাকিসের ইলেকট্রনিক যোগাযোগের তথ্য এবং তাঁর নামে তৈরি একটি নথি পরীক্ষা করেন। নথিটির শিরোনাম ছিল ‘হোয়াই আই ফট: এ.কে.এ. (অরোরা শুটারের ম্যানিফেস্টো)’। এতে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও উগ্রপন্থী মতাদর্শের পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত, বিশেষ করে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উল্লেখ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পালাটাইন ও মাউন্ট প্রসপেক্ট পুলিশ বিভাগের সমন্বিত অভিযানে ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পাপোরাকিসকে আটক করা হয়।
পরে তাঁর বাসায় তল্লাশি চালিয়ে একটি রাইফেল, একাধিক গুলিভর্তি রাইফেলের ম্যাগাজিন, শত শত অতিরিক্ত গুলি, কৌশলগত সরঞ্জাম এবং তদন্তে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া একটি কৌশলগত পোশাকের সঙ্গে বডি আর্মার এবং শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী উগ্রপন্থার প্রতীকসংবলিত একটি প্যাচ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সন্ত্রাসী হুমকি ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ
পাপোরাকিসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়া এবং অবৈধভাবে অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে ১৬ ইঞ্চির চেয়ে ছোট ব্যারেলযুক্ত একটি রাইফেল রাখার বিষয়টি রয়েছে।
পালাটাইন পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তদন্ত চলমান থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আনা হতে পারে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে অরোরা পুলিশ বিভাগকেও জানানো হয়েছিল। পালাটাইন ও মাউন্ট প্রসপেক্ট পুলিশ সংশ্লিষ্ট এলাকার হিন্দু উপাসনালয়গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করে।
তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনসাধারণের জন্য বর্তমানে কোনো চলমান হুমকির তথ্য পাওয়া যায়নি।
হিন্দু সংগঠনের প্রতিক্রিয়া, মন্দিরে বাড়তি নিরাপত্তা
ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসা করেছে হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সংগঠনটি বলেছে, সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং সন্দেহজনক কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষের ভয়মুক্ত পরিবেশে উপাসনা করার অধিকার রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
অন্য একটি পোস্টে সংগঠনটি দাবি করেছে, অস্ত্রসজ্জিত পাপোরাকিস হিন্দু মন্দিরে পৌঁছে গুলি চালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর বন্দুক আটকে যায়। তবে এ দাবির সব বিবরণ পুলিশের বক্তব্যে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
অরোরার শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী (বালাজি) মন্দির কর্তৃপক্ষও ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এ বিষয়ে অরোরা পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়, ভক্ত, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মন্দিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তকারীরা এখনো হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থল নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তাঁদের ধারণা, অরোরার দক্ষিণ-পশ্চিম শহরতলির বৃহত্তম হিন্দু মন্দিরকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা থাকতে পারে। শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী (বালাজি) মন্দিরটি ইলিনয়ের অরোরা এলাকার বৃহত্তম হিন্দু মন্দির।
সূত্র: এনডিটিভি
গাজায় হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও চলছে জলপাই সংগ্রহ
তথ্য ফাঁসকারীদের ‘গুলি করে মারা উচিত’: ট্রাম্প