সাধারণ অসুখ ভেবে অবহেলা, হতে পারে ক্যানসারের লক্ষণ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

কাশি, পেটে ব্যথা, অম্বল কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তি—এ ধরনের সমস্যা হলে বেশির ভাগ মানুষই সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করেন। কখনো নিজে ওষুধ খান, আবার কখনো কাজের চাপ, বয়স বা খাবারের অভ্যাসকে দায়ী করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মনে হওয়া এসব উপসর্গই ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় মৃদু ও অস্পষ্ট হয়। সাধারণ রোগের উপসর্গের সঙ্গে মিল থাকায় সহজেই তা চোখ এড়িয়ে যায়। ব্যস্ততা, চিকিৎসকের কাছে যেতে অনীহা, ভয় কিংবা সামাজিক সংকোচও রোগ শনাক্তে দেরি করাতে পারে। সাধারণ অসুস্থতার উপসর্গ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কয়েক দিন বা এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে কমে আসে। কিন্তু ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট কিছু উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, বারবার দেখা দিতে পারে কিংবা সময়ের সঙ্গে বাড়তে পারে।

যেসব সাধারণ লক্ষণে সতর্ক হওয়া জরুরি

১. দীর্ঘদিনের কাশি

সর্দি-কাশি, অ্যালার্জি, ধূমপান, বায়ুদূষণ কিংবা যক্ষ্মার কারণে কাশি হতে পারে। তবে তিন সপ্তাহের বেশি কাশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া, বারবার বুকে সংক্রমণ কিংবা অকারণে ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী কাশি ফুসফুসের ক্যানসারের লক্ষণও হতে পারে।

২. দীর্ঘস্থায়ী অম্বল ও বদহজম

অনেকেই গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি কিংবা মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণে বদহজম হচ্ছে বলে মনে করেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে অ্যান্টাসিড খাওয়ার পরও সমস্যা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। খাবার গিলতে অসুবিধা বা ব্যথা, অল্প খেয়েই পেট ভরে যাওয়া, বারবার বমি, বমির সঙ্গে রক্ত কিংবা কালো পায়খানা হলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি। এসব উপসর্গ পাকস্থলী বা খাদ্যনালির ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

৩. পায়খানার অভ্যাসে পরিবর্তন

কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, পাইলস বা খাবারের পরিবর্তনের কারণে পায়খানার অভ্যাসে সমস্যা হতে পারে। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া চলতে থাকলে, পায়খানার আকার সরু হয়ে গেলে কিংবা মলত্যাগের পরও পেট পরিষ্কার হয়নি বলে মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। মলের সঙ্গে রক্ত, অকারণে পেটে ব্যথা বা পেট ফাঁপা এবং রক্তস্বল্পতাও সতর্কসংকেত। এসব লক্ষণ বৃহদান্ত্র বা মলাশয়ের ক্যানসারের ইঙ্গিত হতে পারে। আগে পাইলস থাকলেও নতুন করে রক্তপাত শুরু হলে সেটিকে শুধু পাইলস ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়।

৪. মুখে ঘা বা সাদা-লাল দাগ

ভিটামিনের ঘাটতি, ঝাল খাবার, মানসিক চাপ কিংবা দাঁতের ঘষা লেগে মুখে ঘা হতে পারে। তবে দুই থেকে তিন সপ্তাহেও ঘা না শুকালে, জিহ্বা বা গালের ভেতরে সাদা কিংবা লাল দাগ দেখা দিলে এবং কোনো স্থানে পিণ্ড বা অস্বাভাবিক পুরুত্ব অনুভূত হলে চিকিৎসক বা দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মুখ খুলতে অসুবিধা হলেও সতর্ক হতে হবে। তামাক, জর্দা, গুল, সুপারি বা অ্যালকোহল ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বিবেচনায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

৫. কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া

গলার সংক্রমণ, অতিরিক্ত কথা বলা বা অ্যালার্জির কারণে কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কণ্ঠস্বর ভাঙা বা কর্কশ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। বিশেষ করে ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা অবহেলা করা উচিত নয়। এটি স্বরযন্ত্র বা গলার ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। কখনো থাইরয়েড বা ফুসফুসের ক্যানসার স্নায়ুতে প্রভাব ফেললেও কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হতে পারে।

৬. অকারণে অতিরিক্ত ক্লান্তি

কাজের চাপ, ঘুমের অভাব কিংবা বয়স বাড়ার কারণে ক্লান্তি আসতে পারে। তবে পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও ক্লান্তি না কমলে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, সহজে শরীরে কালশিটে পড়া কিংবা ঘন ঘন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার মতো রক্তের ক্যানসার এবং পাকস্থলী বা অন্ত্রে গোপন রক্তক্ষরণের কারণে সৃষ্ট রক্তস্বল্পতাও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির কারণ হতে পারে। সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এ বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।

৭. দীর্ঘস্থায়ী পিঠব্যথা

ভুলভাবে বসা, পেশিতে টান বা মেরুদণ্ডের সমস্যায় পিঠে ব্যথা হতে পারে। তবে বিরল ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়, কিডনি বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, মাল্টিপল মায়েলোমা কিংবা শরীরের অন্য স্থান থেকে মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের কারণেও ব্যথা হতে পারে। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমে বাড়লে, রাতে বা শুয়ে থাকলে বেশি অনুভূত হলে এবং এর সঙ্গে ওজন কমে যাওয়া, জ্বর বা পায়ে দুর্বলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৮. নারীদের পেট ফাঁপা

বদহজম, মাসিকের সময়কার পরিবর্তন কিংবা ওজন বাড়ার কারণে নারীদের পেট ফাঁপতে পারে। কিন্তু তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিন পেট ফাঁপা থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। এর সঙ্গে তলপেটে ব্যথা, অল্প খেয়েই পেট ভরে যাওয়া বা ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ থাকলে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের সম্ভাবনা যাচাই করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

৯. অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত

হরমোনের পরিবর্তন, অনিয়মিত মাসিক বা মেনোপজের কারণে রক্তপাতের ধরন বদলাতে পারে। তবে মেনোপজের পর একবারও রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মাসিকের মাঝখানে বা যৌনমিলনের পর রক্তপাত এবং অস্বাভাবিক দুর্গন্ধযুক্ত স্রাবও অবহেলা করা উচিত নয়। এসব লক্ষণ জরায়ুমুখ বা জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

১০. পুরুষদের ঘন ঘন প্রস্রাব

বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হলে প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে প্রস্রাব শুরু করতে অসুবিধা, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হওয়া, প্রস্রাবে রক্ত কিংবা কোমর ও নিতম্বে ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এসব উপসর্গ প্রোস্টেট বা মূত্রথলির ক্যানসারের লক্ষণও হতে পারে।

১১. শরীরের গ্রন্থি বা লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া

গলার সংক্রমণ বা অন্য কোনো সাধারণ রোগে লসিকাগ্রন্থি ফুলে যেতে পারে। তবে দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গ্রন্থি ফোলা থাকলে, তা শক্ত বা রাবারের মতো অনুভূত হলে কিংবা এর সঙ্গে রাতে অতিরিক্ত ঘাম, জ্বর বা ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। লিম্ফোমা, লিউকেমিয়া বা শরীরের অন্য স্থান থেকে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের কারণেও এমন হতে পারে।

১২. ত্বকের পরিবর্তন

ত্বকে তিল, পোকামাকড়ের কামড় বা ছোটখাটো ক্ষত সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে কোনো তিলের আকার, আকৃতি বা রং বদলে গেলে, সেটি থেকে রক্তপাত বা চুলকানি হলে কিংবা কোনো ক্ষত দীর্ঘদিনেও না শুকালে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হাতের তালু, পায়ের তলা ও নখের পরিবর্তনও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এসব পরিবর্তন মেলানোমাসহ বিভিন্ন ধরনের ত্বকের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।

১৩. দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা

মাইগ্রেন, মানসিক চাপ বা চোখের সমস্যায় মাথাব্যথা হতে পারে। তবে নতুন ধরনের মাথাব্যথা ক্রমে বাড়তে থাকলে, সকালে বেশি অনুভূত হলে কিংবা এর সঙ্গে বমি, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, শরীরের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা খিঁচুনি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। বিরল ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ মস্তিষ্কের টিউমারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

দুই থেকে তিন সপ্তাহের নিয়ম কেন গুরুত্বপূর্ণ

নতুন কোনো উপসর্গের স্পষ্ট কারণ না থাকলে এবং তা দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। তবে রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক রোগী দীর্ঘদিনের অম্বলকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক ভেবে ওষুধ খেতে থাকেন। পরে এন্ডোস্কোপি পরীক্ষায় পাকস্থলীর ক্যানসার ধরা পড়ে। আবার মেনোপজের পর রক্তপাতকে হরমোনজনিত সমস্যা মনে করে কেউ কেউ অবহেলা করেন। পরীক্ষা করানোর পর জরায়ুর ক্যানসার শনাক্ত হয়। তামাক ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মুখের সাদা দাগ দীর্ঘদিন অবহেলার পর ঘায়ে পরিণত হওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। এসব উদাহরণ মনে করিয়ে দেয়, উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করলে রোগ শনাক্তেও বিলম্ব হতে পারে।

নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার ঝুঁকি

অ্যান্টাসিড, ব্যথানাশক, কাশির সিরাপ বা ঘরোয়া চিকিৎসায় সাময়িকভাবে উপসর্গ কমতে পারে। কিন্তু এতে সমস্যার মূল কারণ আড়ালে থেকে যেতে পারে এবং রোগ শনাক্তে দেরি হতে পারে। কয়েক সপ্তাহ ধরে একই সমস্যায় বারবার ওষুধ খেতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পুরুষেরা অনেক সময় ব্যস্ততা বা দুর্বলতা প্রকাশের আশঙ্কায় শারীরিক সমস্যা এড়িয়ে যান। নারীরা পরিবারের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে পারেন। আবার স্তন বা প্রজনন অঙ্গ-সংক্রান্ত সমস্যায় সামাজিক সংকোচও কাজ করে। বয়স্ক ব্যক্তিরা অনেক সময় উপসর্গকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন মনে করেন। অন্যদিকে তরুণেরা বয়স কম বলে গুরুতর অসুস্থতার আশঙ্কা করেন না। তবে বয়স যা-ই হোক, দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক উপসর্গের কারণ জানা জরুরি।

কখন কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে

উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক রক্তের পূর্ণাঙ্গ গণনা (সিবিসি), বুকের এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম, এন্ডোস্কোপি, কোলনোস্কোপি, সিটি স্ক্যান কিংবা বায়োপসির পরামর্শ দিতে পারেন। সবার জন্য একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না; কোন পরীক্ষা করা হবে, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

সাধারণ কাশি বা পেটব্যথা হলেই ক্যানসারের আশঙ্কা করার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব উপসর্গের পেছনে সাধারণ কারণ থাকে। তবে কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে বা ক্রমে বাড়তে থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। সময়মতো পরীক্ষা করালে অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা কমে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব।

সূত্র: আমেরিকান অনকোলজি

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত