যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের 'ভয়' দেখানোর অভিযোগ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদের সামনে উসকানিমূলক সমাবেশ, অনলাইন প্রচার ও নজরদারির মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করার অভিযোগ উঠেছে। এতে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম-আমেরিকানদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (এমপ্যাক)।

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী উসকানি ও ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি তৈরি করছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের কর্মকাণ্ড মুসলিম-আমেরিকানদের ভোটাধিকার প্রয়োগে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে সতর্ক করেছে এমপ্যাক। সংগঠনটির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মসজিদের বাইরে সমাবেশ, মুসলিমদের সঙ্গে আগ্রাসী আচরণ, নজরদারি, অনলাইনে উসকানিমূলক প্রচার এবং যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইসলামি দখলদারত্বের’ মতো বক্তব্যের মাধ্যমে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

এমপ্যাকের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সেন্টার ফর সিকিউরিটি, টেকনোলজি অ্যান্ড পলিসি। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি সমন্বিত প্রচারণার মাধ্যমে প্রথমে কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরপর উসকানিদাতা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রকাশ্যে তাদের মুখোমুখি হয়। এসব ঘটনার ভিডিও ও অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপরাধপ্রবণতার ধারণা তৈরি করা হয়।

পরবর্তী সময়ে এসব প্রচারণাকে ভিত্তি করে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, পুলিশি তৎপরতা, নজরদারি কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ বাড়ানোর দাবি তোলা হয়। এমপ্যাকের আশঙ্কা, ডানপন্থী উসকানিদাতাদের এমন কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অস্থিরতার একটি বিস্তৃত বয়ান তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন সেটিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো কঠোর পদক্ষেপের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা এরই মধ্যে কোনো প্রমাণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানি নির্বাচনী পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

প্রতিবেদনে মুসলিম-আমেরিকানদের উসকানিদাতাদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানো, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো, নিজেদের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং একা না গিয়ে দলবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রে আরব-আমেরিকানদের সবচেয়ে বড় জনবসতিগুলোর একটি এই অঙ্গরাজ্যে। এমপ্যাকের পর্যবেক্ষণে, মুসলিমদের লক্ষ্য করে উসকানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় মিশিগান বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

৩ নভেম্বরের নির্বাচনে মিশিগান থেকে প্রথমবারের মতো কোনো মুসলিম প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য আরও তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত সপ্তাহে মিশিগানের পোর্ট হুরনে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি সেখানে এসেছেন একজন ‘জিহাদি মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্যকে’ যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হওয়া থেকে ঠেকাতে। এল-সায়েদের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করতে চান। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল-সায়েদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের কোনো পরিচিত বা প্রমাণিত যোগসূত্র নেই।

মিশিগানের হিলসডেলে খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী হুতারি মিলিশিয়ার একটি অস্ত্রসমর্থক সমাবেশের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সমাবেশের পর অনলাইনে বিভিন্ন মন্তব্যে গোষ্ঠীটির সদস্যদের মুসলিম অধ্যুষিত ডিয়ারবর্নে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া গত আগস্টে ডেট্রয়েটের উপশহর ডিয়ারবর্ন হাইটসে কু ক্লাক্স ক্ল্যান (কেকেকে) হাজার হাজার প্রচারপত্র ছড়িয়ে দেয়। এলাকাটিতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য বসবাস রয়েছে।

এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ডেট্রয়েট, হ্যামট্রাম্যাক, ল্যানসিং ও ইস্ট ল্যানসিংয়ে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠায়। বিচার বিভাগের এই পদক্ষেপের ঘোষিত কারণ নিয়ে মিশিগানের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তোলেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কা প্রকাশ করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর আগে ডিয়ারবর্নে মুসলিমদের একটি সমাবেশে ডানপন্থী উসকানিদাতা জেক ল্যাং ও তাঁর সহযোগীরা উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে ইউটিউবার নেট ফ্রিডম্যানের একটি তথ্যচিত্রে মিশিগানে ‘ইসলামি দখলদারত্বের’ অভিযোগ তোলা হয়।

মুসলিম ভোটারদের ভয় দেখানোর আশঙ্কার প্রসঙ্গে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে এমপ্যাক। গত মে মাসে রজার্স বলেছিলেন, তিনি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটিকে ডেট্রয়েটের ভোটকেন্দ্রে পুলিশ কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত বা দায়িত্বের বাইরে থাকা পুলিশ সদস্যদের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার বক্তব্য ছিল, এতে কেউ তাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করলে তা মোকাবিলা করা যাবে। এমপ্যাকের মতে, নির্বাচনী পর্যবেক্ষণের নামে এ ধরনের বক্তব্য ও উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটারের সংখ্যা বেশি, সেখানে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানি এবং ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদের জয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বর্তমানে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সের চেয়ে সাত পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন। তার জয় ডেমোক্র্যাটদের সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখতে পারে।

এমপ্যাকের মূল উদ্বেগ, মুসলিমবিরোধী প্রচারণা কেবল একটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকারকেও প্রভাবিত করতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখিয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে রাখার পরিস্থিতি তৈরি হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠবে। প্রতিবেদনটি তাই মুসলিম-আমেরিকানদের ভয় না পেয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সামনে এনেছে।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত