যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর ইরানের অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি খাত, সরাসরি ও ব্যাপক চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন যুদ্ধ অবসানের শর্ত হিসেবে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এই অবরোধ কার্যকর করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অবরোধ শুরু হয় সোমবার (১৩ এপ্রিল) ১৪:০০ গ্রিনিচ মান সময় থেকে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এটিকে সরাসরি 'অবৈধ পদক্ষেপ' এবং 'ডাকাতির সমতুল্য কাজ' বলে আখ্যা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে তারা দাবি করেছে।
তেল রপ্তানির ওপর সরাসরি আঘাতের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো তেল ও গ্যাস রপ্তানি, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এই জলপথ দিয়েই বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ প্রবাহিত হয়, এবং ইরানের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ এই পথের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পরও ইরান এই প্রণালি দিয়ে রপ্তানি অব্যাহত রাখলেও নতুন নৌ অবরোধ সেই প্রবাহকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, পুরো জ্বালানি অর্থনীতির কাঠামোই চাপে পড়তে পারে।
রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেলেও নতুন ঝুঁকি তৈরি
তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরান দৈনিক ১.৭ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে বলে ট্রেড ইন্টেলিজেন্স সংস্থা 'কেপলার' জানিয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করায় ইরানের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এমনকি যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে তেল রপ্তানি থেকে ইরানের আয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে নতুন অবরোধ কার্যকর হওয়ার ফলে এই প্রবণতা হঠাৎ করেই উল্টে যেতে পারে এবং রাজস্ব আয়ে বড় ধস নামতে পারে।
অবরোধে বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ
শুধু তেল নয়, ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক, কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য রপ্তানি খাতও এই অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। একইভাবে আমদানি খাতেও বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে, যেখানে শিল্প যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও খাদ্যপণ্য প্রধান ভূমিকা রাখে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে, নতুন অবরোধ সেই চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
বিকল্প রুট থাকলেও সীমিত সক্ষমতা
ইরান-চীন রেল সংযোগসহ কিছু বিকল্প বাণিজ্য রুট থাকলেও তা সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এই রেলপথ মূলত সীমিত পরিমাণ পণ্য পরিবহনে সক্ষম এবং তেল রপ্তানির জন্য কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত নয়।
এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে 'ঘোস্ট শিপ' ব্যবহারের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টা থাকলেও নতুন অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এখন হলো এই অবরোধ কতদিন স্থায়ী হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য কী। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে তা আবারও সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে, নতুবা কূটনৈতিক সমঝোতার দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে চীনের ভূমিকা, কারণ ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশই এই বাজারের দিকে যায়। ফলে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর। সূত্র: আলজাজিরা
এবার ইরানকে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস সৌদি আরবের
উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফেরার তাগিদ ম্যাক্রোঁ'র
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে নিজেদের সংকট আরও বাড়বে: পেজেশকিয়ান
কিমের উপস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
হরমুজ সংকট সমাধানে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে ভিডিও সম্মেলন
