জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বিশ্বনেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো নিয়ে তীব্র আক্রমণ, হাতে থাকা জাতিসংঘ সনদের কপি ছিঁড়ে ফেলা এবং নির্ধারিত সময়ের প্রায় ছয় গুণ বেশি সময় ধরে ভাষণ—২০০৯ সালে লিবিয়ার তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সেই বক্তৃতা আজও জাতিসংঘের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
২০০৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৬৪তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন গাদ্দাফি। প্রায় ৪০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সেটিই ছিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম উপস্থিতি। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে তাঁর বক্তব্যের সময়কাল ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সাধারণ বক্তব্যের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল প্রায় ১৫ মিনিট।
গাদ্দাফির দীর্ঘ বক্তৃতার কারণে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের স্বাভাবিক সময়সূচিও ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে হলরুমের অনেক আসন ফাঁকা হয়ে যায়। সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর বক্তব্যের সময় একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে ইংরেজি ভাষার এক দোভাষীকে সরিয়ে অন্য একজন দায়িত্ব নেন। একটি এএফপি প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই দোভাষী প্রায় ৭৫ মিনিট পর ‘আমি আর পারছি না’ বলে দায়িত্ব থেকে সরে যান এবং জাতিসংঘের আরবি বিভাগের প্রধান পরবর্তী প্রায় ২০ মিনিট অনুবাদ করেন।
নিরাপত্তা পরিষদকে ‘সন্ত্রাস পরিষদ’ বলেছিলেন
গাদ্দাফির ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমালোচনা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের স্থায়ী সদস্যপদ এবং ভেটো ক্ষমতার বিরোধিতা করেন তিনি।
তৎকালীন পাঁচ স্থায়ী সদস্যের হাতে থাকা ভেটো ক্ষমতাকে তিনি ক্ষমতার অসম বণ্টন হিসেবে তুলে ধরেন। এমনকি নিরাপত্তা পরিষদকে ‘Security Council’ না বলে ‘Terror Council’ বা ‘সন্ত্রাস পরিষদ’ বলা উচিত বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল যুক্তি ছিল—বিশ্বের অধিকাংশ দেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সমান মর্যাদা পেলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ক্ষমতা অনেক বেশি।
গাদ্দাফি প্রশ্ন তোলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর এতগুলো যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ করতে না পারলে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা কোথায়। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ক্ষমতা কমানো এবং আফ্রিকার জন্য আরও প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান।
জাতিসংঘ সনদ হাতে নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ
ভাষণের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি ছিল জাতিসংঘ সনদ নিয়ে গাদ্দাফির নাটকীয় আচরণ। তিনি জাতিসংঘ সনদের একটি কপি হাতে তুলে ধরে এর নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একপর্যায়ে তিনি সনদের কপি ছিঁড়ে ফেলেন। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের প্রতিবেদনেও তাঁর জাতিসংঘ সনদ ছিঁড়ে ফেলার কথা উল্লেখ করা হয়। দ্য গার্ডিয়ানও ঘটনাটিকে তাঁর ভাষণের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বর্ণনায় তিনি ছেঁড়া পাতাগুলো জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের ডেস্কে ছুড়ে মেরেছিলেন—এমন দাবি করা হলেও নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক সূত্রে এই নির্দিষ্ট বিবরণের স্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায় না। তাই ঘটনাটিকে নিশ্চিতভাবে সেভাবে বর্ণনা করার চেয়ে ‘সনদের কপি ছিঁড়ে ফেলেন’ বলাই বেশি নির্ভরযোগ্য।
কেন এত ক্ষুব্ধ ছিলেন গাদ্দাফি?
গাদ্দাফির বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, ইরাক যুদ্ধ, আফ্রিকার প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের আচরণ এবং জাতিসংঘের কাঠামো নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠে আসে।
তিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির হত্যাকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে এমন কিছু ষড়যন্ত্রতত্ত্বও উঠে আসে, যার মধ্যে সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস সামরিক বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো গবেষণাগার থেকে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথাও ছিল।
গাদ্দাফি আরও বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তাঁর দাবি ছিল, নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো বিশ্বশান্তির বদলে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
নিউইয়র্কে ‘বেদুঈন তাঁবু’ নিয়েও নাটক
গাদ্দাফির নিউইয়র্ক সফরের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল তাঁর ঐতিহ্যবাহী বেদুঈন তাঁবু। যুক্তরাষ্ট্র সফরে তিনি হোটেলে থাকার বদলে নিজের জন্য একটি বড় তাঁবু স্থাপন করতে চেয়েছিলেন।
প্রথমে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে তাঁবু স্থাপনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। পরে নিউ জার্সির এনগেলউডে তাঁবু স্থাপনের পরিকল্পনাও স্থানীয় বিরোধিতার মুখে বাধাগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কের ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মালিকানাধীন ‘সেভেন স্প্রিংস’ সম্পত্তিতে একটি বড় তাঁবু স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে সেখানে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সমসাময়িক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প অর্গানাইজেশন দাবি করেছিল, সম্পত্তিটি স্বল্পমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছিল এবং গাদ্দাফির সেখানে থাকার পরিকল্পনার বিষয়ে তারা আগে থেকে অবগত ছিল না।
ইতিহাসে থেকে গেছে সেই ৯৬ মিনিট
গাদ্দাফির ২০০৯ সালের ভাষণ ছিল শুধু দীর্ঘ নয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরনেও ছিল ব্যতিক্রমী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাষণের পর তিনি জাতিসংঘের মঞ্চে ওঠেন এবং নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধ, আফ্রিকার অধিকার, সোয়াইন ফ্লু ও কেনেডি হত্যাকাণ্ড—বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে তুলে ধরেন।
তবে দীর্ঘতম ভাষণের রেকর্ড তাঁর ছিল না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সবচেয়ে দীর্ঘ আলোচিত ভাষণগুলোর একটি ছিল কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোর ১৯৬০ সালের প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার বক্তব্য।
গাদ্দাফির সেই ভাষণ নিয়ে তখন যেমন সমালোচনা হয়েছিল, তেমনি তাঁর জাতিসংঘ সংস্কারের প্রশ্নগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত নাটকীয় ও প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির বাইরে; কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির দীর্ঘদিনের বিতর্কের অংশ।
২০০৯ সালের সেই দিনটির সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্য তাই শুধু গাদ্দাফির দীর্ঘ বক্তৃতা নয়—বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘের কাঠামোকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানানো এক নেতার নাটকীয় উপস্থিতি।
শাহজালাল বিমানবন্দরে ৩৬ ভরি স্বর্ণালংকারসহ গ্রেপ্তার ৩
সৌদির ইয়ানবু বন্দরে সেনা পাঠাবে ফ্রান্স
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের ফল প্রকাশ
জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে লিগ্যাল অফিসার হলেন জাইমা
৭টি শট নিয়েও গোলশূন্য রোনালদো, তবুও জিতলো পর্তুগাল