ইরানকে প্রস্তরযুগে ফেরানোর স্বপ্ন ব্যর্থ: মোজতবা খামেনি

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

ইরানকে প্রস্তরযুগ, অপমান, পরনির্ভরতা ও দুর্নামের যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার শত্রুর পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা হোসেইনি খামেনি। তিনি বলেছেন, অতীতে ইরানের দক্ষিণের সমুদ্রসীমা শত্রুদের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও এখন ইরানি যোদ্ধা ও হরমুজ প্রণালির রক্ষকদের হাতে ধারাবাহিক আঘাত পাওয়ার পর তারা আরব সাগর পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস করে না।

পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ এবং হিজবুল্লাহর সাবেক মহাসচিব শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরাল্লাহর দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে খামেনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ইরানকে সব ক্ষেত্রে পরাজিত করার শত্রুর স্বপ্নও কখনো বাস্তবায়িত হবে না এবং অতীতের সেই সময়ে দেশকে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

খামেনি বলেন, বিপ্লবের পর প্রথম দশকে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের মাধ্যমে আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ইরানকে প্রস্তরযুগ, অপমান, পরনির্ভরতা ও দুর্নামের যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এত ব্যাপক প্রচেষ্টার পরও ইসলামী প্রজাতন্ত্র আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ়ভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইরান আরও শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে দেশের শত্রুরা এখন সব দিক থেকে ইরানের মোকাবিলা করতে ভয় পায়।

দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রসীমা প্রসঙ্গে খামেনি বলেন, একসময় ওই দুটি সমুদ্র শত্রু বাহিনীর জন্য খেলাঘরের মতো ছিল। কিন্তু সাহসী ও শক্তিশালী ইরানি যোদ্ধা এবং হরমুজ প্রণালির রক্ষকদের কাছ থেকে বেদনাদায়ক আঘাত পাওয়ার পর তারা এখন আরব সাগরের ওপারে এগিয়ে যাওয়ার সাহস করে না। যখনই তারা এমন ঝুঁকি নিয়েছে, তখন নিজেরাই ক্ষতির মুখে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খামেনি বলেন, খুব বেশি সময় লাগবে না, আরব সাগরও শত্রুদের উপস্থিতি থেকে মুক্ত হবে। তিনি আরও বলেন, শত্রুরা যে অতীতে ইরানকে ফিরিয়ে নিতে চায়, সেই দিন শেষ হয়ে গেছে এবং তা আর কখনো ফিরে আসবে না।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনির নেতৃত্বের কথা তুলে ধরে খামেনি বলেন, সেই বিপ্লব বিদেশি আধিপত্যের একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছিল। তখন আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর রাষ্ট্রদূতরা ক্ষমতাচ্যুত শাহের কাছে ইরানের নীতি নির্ধারণ করে দিতেন।

তিনি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উল্টে দেওয়ার জন্য প্রথম চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ছিল বিপ্লবের প্রথম দশকে শত্রুদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেই যুদ্ধ থেকেই ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র আরও শক্তিশালী, আরও উচ্চকণ্ঠ ও আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। এরপর প্রতিটি সংকটই এই শক্তি বৃদ্ধির ধারাকে আরও দৃঢ় করেছে।

খামেনি বলেন, শত্রুরা ইরানকে প্রস্তরযুগ, অপমান, পরনির্ভরতা ও দুর্নামের দিকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এখন কেউ কেউ ইরানকে চতুর্থ পরাশক্তি হিসেবে অভিহিত করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে ‘ঐশ্বরিক হিসাব’ অনুযায়ী ইরানকে প্রথম শক্তি হিসেবে দেখা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যে হিজবুল্লাহর সাবেক মহাসচিব শহীদ হাসান নাসরাল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে খামেনি তাকে প্রতিরোধ ফ্রন্টের একজন বীর আরব কমান্ডার ও মহান প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, নাসরাল্লাহর বিপরীতে যারা প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে, তারা বিস্মৃত হবে এবং তাদের মন্দ, অবিবেচক কিংবা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে স্মরণ করা হবে।

হিজবুল্লাহর বর্তমান মহাসচিব শেখ নাঈম কাসেম নাসরাল্লাহর গৌরবের পতাকা বহন করছেন এবং তার পথ অনুসরণ করে চলেছেন বলেও মন্তব্য করেন খামেনি। নাসরাল্লাহর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সমর্থকদের পাশাপাশি প্রতিরোধ বাহিনীর মনোবল দৃঢ় করেছিল এবং আঞ্চলিক অঙ্গনে লেবাননের অবস্থান শক্তিশালী করেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

খামেনি আরও বলেন, নাসরাল্লাহ, সাইয়্যেদ হাশেম সাফিয়েদ্দিন ও অন্যান্য প্রতিরোধযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলতে থাকবে। লেবাননের বর্তমান সময় প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে খামেনি বলেন, একসময় যারা ইরানের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করত, এখন তাদের ইরানের সামরিক সক্ষমতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কয়েক দশক আগের তুলনায় ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখন শক্তির ভারসাম্যকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

দেশটির প্রতিরক্ষায় ইরানি জনগণের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের প্রশংসা করে তিনি বলেন, নারীরাও সাহসী জনসম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ইরানের বৈধ অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে দেশটির অবস্থানকেও সমর্থন করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বক্তব্যের শেষদিকে খামেনি ইমাম খোমেনি এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের কথাও স্মরণ করেন। তাদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ইরানের আরও শক্তিশালী ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

খামেনি আশা প্রকাশ করেন, ইরানি জাতি এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের সব মিত্রের জন্য সামনে বিজয়, সাফল্য ও সম্মান অপেক্ষা করছে; অন্যদিকে তাদের শত্রুদের জন্য অপেক্ষা করছে পরাজয় ও অপমান। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন