মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৩ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজনের বেশি সামরিক ঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালানোর ক্ষেত্রে প্রথমে আকাশ প্রতিরক্ষার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও রাডারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। এরপর বিমান, গুদাম, সেনাদের আবাসনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর কয়েকশ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এপি এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত ইরান বা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দাবি করা ১১৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ২৬টি সামরিক ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের সরঞ্জাম থাকা অন্যান্য স্থাপনার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

এপি জানিয়েছে, ইরান শুরুতে বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং শত্রুপক্ষের হামলা শনাক্ত করার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে পরবর্তী সময়ে গুদাম, সেনাদের আবাসন ও ঘাঁটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার সুযোগ তৈরি হয়।

হামলার ক্ষয়ক্ষতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা এপিকে জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য উপকরণ।

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে তেহরানও বড় ধরনের পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ আবার শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র এসব ঘাঁটি ও সরঞ্জাম পুনর্নির্মাণ করবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে শত শত ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের মানবিক ও সামরিক সরঞ্জামগত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। এমনকি স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশে বিলম্বসহ বাইরের পর্যবেক্ষণ বাধাগ্রস্ত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ঘাঁটি ও সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, এ ধরনের তথ্য প্রকাশে সামরিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

তবে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলো সুরক্ষিত রয়েছে এবং দেশটির সামরিক বাহিনী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। এপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে সেন্টকমের সেনাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই দেওয়া হয়েছে।

এপির স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের অধিকাংশ হামলা হয়েছে কুয়েতে। এ ছাড়া বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সেনাদের ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয়েছিল কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবা এলাকায়। ১ মার্চ ড্রোন হামলায় সেখানে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন।

কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অন্তত ৩০ বার হামলা হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১৫টি বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, একাধিক গুদাম এবং আবাসিক এলাকার কাছাকাছি ১০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েরিংয়ে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হয়েছে। ইরানের হামলায় ঘাঁটির অধিকাংশ হ্যাঙ্গার ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সেখানে বিমানসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় সেনাদের সমবেত হওয়ার স্থানগুলোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। মার্চে ঘাঁটির জিমনেসিয়াম ধ্বংস হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে সেনাদের জন্য পণ্য বিক্রির একটি দোকানেও হামলা হয়।

দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্যাম্প বুয়েরিংয়ের গ্যারেজ ও খাবারঘরও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংবেদনশীল সামরিক তথ্য প্রকাশের কারণে ওই কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এপির সঙ্গে কথা বলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে র‍্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের পরিচালক রাফায়েল কোহেন বলেন, ইরানের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও আঘাতের পরিমাণ অনেক কম হলেও মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতি অনিবার্য ছিল। তাঁর মতে, আধুনিক যুদ্ধের ধরনে কম খরচের ড্রোনের বড় আকারের হামলার ঝুঁকি থেকে কোনো সামরিক বাহিনীই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

কোহেন বলেন, “এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।”

যুদ্ধ শুরুর পর ইরান প্রথমে শত্রুপক্ষের হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলোতে নির্ভুল হামলা চালায়। এরপর মার্কিন ঘাঁটির কার্যক্রম সচল রাখা এবং সেনাদের বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ভবন ও সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলা বাড়ায়।

যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুই দিনের মধ্যেই কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান এবং বাহরাইনের নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটির রাডারব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে ইরান। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা বহনযোগ্য রাডারেও হামলা চালানো হয়।

প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেসের পরিচালক এন আর জেনজেন-জোনস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত গুরুত্বপূর্ণ আগাম সতর্কতা রাডারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। এসব রাডার মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল।

জর্ডানে একটি রাডার হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেথিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছে এ ধরনের রাডার ছিল মাত্র ১৩টি। বাজেটসংক্রান্ত নথিতে প্রতিটির মূল্য প্রায় ৫০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাতারেও আরেকটি রাডার গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। ২০১৩ সালে ১১০ কোটি ডলারের একটি চুক্তির মাধ্যমে কাতার এটি কিনেছিল। ওই অঞ্চলে এ ধরনের রাডার এটিই একমাত্র ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেনজেন-জোনসের মতে, এ ধরনের স্থাপনায় হামলার উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী আক্রমণের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সক্ষমতা ব্যাহত ও দুর্বল করে দেওয়া।

রাডারগুলোতে হামলার পর যুদ্ধের প্রথম মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম থাকা ১৮টি স্থানে ৫০টির বেশি সফল হামলা চালায় ইরান। এসব হামলায় বিমানসংক্রান্ত স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন ঘাঁটিতে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং সেনাদের আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমানের পেছনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের একটি সিআইএ ইউনিটেও হামলা হয়।

সম্প্রতি সৌদি বিমানঘাঁটি পরিদর্শন করা আরেক আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। তিনি ধ্বংসাবশেষ, নির্মাণসামগ্রীর ভাঙা অংশ, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম, বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত সেনা ব্যারাক ও খাবারঘর দেখেছেন বলে জানান।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নজরদারি বিমানে আঘাত হানা হামলায় আরও কয়েকটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে দুটি আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারও ছিল। অক্টোবরে হালনাগাদ করা কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির প্রায় ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত আল ধাফরা বিমানঘাঁটিতেও যুদ্ধের শুরুর দিকে বারবার হামলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে বিমান রাখার হ্যাঙ্গার ও অন্যান্য অবকাঠামো রয়েছে। এ ছাড়া আগাম সতর্কতা রাডার এবং নজরদারি ড্রোনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী এক আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বড় কয়েকটি স্যাটেলাইট সেবা প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মকর্তাদের অনুরোধে উপগ্রহচিত্র প্রকাশ বন্ধ রেখেছে বা বিলম্বিত করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে এ অনুরোধ জানানো হয়। ফলে হামলার ক্ষয়ক্ষতি স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। পরে এয়ারবাসের মালিকানাধীন স্যাটেলাইট সেবা প্রতিষ্ঠান ওয়ানঅ্যাটলাসের চিত্র পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করা সম্ভব হয়।

কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েরিংয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের উচ্চমানের স্যাটেলাইট চিত্র পাওয়া যায় আগস্টের শেষ দিকে। মার্চের শুরুতে চিত্র প্রকাশ বন্ধ হওয়ার পর আগস্টে তা আবার পাওয়া পর্যন্ত ঘাঁটিটির ৩০টির বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল। এপি নিশ্চিত করেছে, মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুলাই মাসে ওই ঘাঁটিতে একাধিকবার হামলা চালানো হয়।

যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে কয়েক মাস পরও কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই আবার সংঘাত শুরুর সম্ভাবনার কথা বলছে। ফলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

র‍্যান্ডের বিশ্লেষক রাফায়েল কোহেন বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে এ ধরনের যুদ্ধপরিবেশের মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর ভাষায়, সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধের সময়ের মতো স্থায়ী অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার ধারণা এখন আর কার্যকর থাকছে না।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)

এমএজেড
আরও পড়ুন