ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি এখন রূপ নিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী এক সংঘাতে। আর এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ইউক্রেন, কোরীয় উপদ্বীপ, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরসহ বিশ্বের বিভিন্ন সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুরুতে ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার পরিবর্তন এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগের মতো লক্ষ্য সামনে এনেছিলেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সেই লক্ষ্য অনেকটাই বদলে এখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কার্যত অচল করে দেওয়ার দিকে নেমে এসেছে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ। ইরানের পাল্টা হামলা মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। এর ফলে ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদও মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি মাসে সিএনএনকে জানান, রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে যত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা প্রয়োজন, তার মাত্র এক-দশমাংশ ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। এরই মধ্যে চলতি গ্রীষ্ম ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিকদের জন্য ২০২২ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময় হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও মস্কোর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের চাপকে দুর্বল করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও সার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ার চাপ সামলাতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এর ফলে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাতে রাশিয়ার আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেকজান্ডার গাবুয়েভের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ায় রাশিয়া নতুন ক্রেতা খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। জুনে কাজানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের অংশগ্রহণকে তিনি এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে ইরান যুদ্ধের সব প্রভাবই ইউক্রেনের জন্য নেতিবাচক নয়। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইউক্রেন ড্রোন ব্যবহারে যে সক্ষমতা অর্জন করেছে, তা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নজরে এসেছে। এর ফলে কিয়েভের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অস্ত্র সরবরাহের নতুন উদ্যোগও তৈরি হয়েছে।
কোরীয় উপদ্বীপেও বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধের ছায়া পড়েছে কোরীয় উপদ্বীপেও। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। কিন্তু চলতি বছর ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ইরান যুদ্ধে সিউলের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না করাও এর অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যৌথ সামরিক মহড়া কমে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা একটি উভচর অবতরণ মহড়াও বাতিল করা হয়েছে। ওই মহড়ায় জাপানের ওকিনাওয়ায় মোতায়েন মার্কিন মেরিন সেনাদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সময় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পেন্টাগন ঠিক কতগুলো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়েছে, তা প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, প্যাট্রিয়টের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়াতে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। জাপানে মোতায়েন ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে আরব সাগরে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরি না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতার মুখে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতে পারে ফিলিপাইন। দক্ষিণ চীন সাগরে স্কারবরো শোল ও সেকেন্ড থমাস শোলকে ঘিরে বেইজিং ও ম্যানিলার মধ্যে উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। এসব এলাকায় চীনা ও ফিলিপাইনি বাহিনীর মধ্যে একাধিকবার সমুদ্রপথে সংঘর্ষও হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বড় সংঘাতে রূপ নিলে ওই অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরির অনুপস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য বড় কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এমিলি হার্ডিং বলেন, এখনো এসব সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্র পূর্ণাঙ্গ সংকটে পরিণত হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তা তার বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তার মতে, এখনই ভবন কাঁপতে শুরু করেনি; বরং ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকার ভিত্তিগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
হরমুজের নজির ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় ঝুঁকি আন্তর্জাতিক নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোকে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও রাজনৈতিক বা সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে কি না, তা নিয়ে। হরমুজ প্রণালির সংকট সেই সম্ভাবনার একটি নজির তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র কতদিন এই যুদ্ধে জড়িয়ে থাকে তার ওপর। ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে পড়াকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ফল হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে সংঘাত আরও দীর্ঘ হতে পারে। তার প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে শুধু কার্যত অচল করে দেওয়াকেই যদি ওয়াশিংটন যথেষ্ট মনে করে, তাহলে যুদ্ধের পরিসর কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালির সংকট সমাধান করা সহজ হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এখন মূল লক্ষ্য টিকে থাকা। আর ছয় মাসের যুদ্ধের পরও তেহরান টিকে আছে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত করার সক্ষমতাও ইরানের হাতে রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরও বড় বৈশ্বিক সংকটের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। সূত্র: সিএনএন
মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে: গালিবাফ
সমঝোতায় পৌঁছাতে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত দিলো ইরান
ইরান চুক্তির দরজা বন্ধ করলেন ট্রাম্প
নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতি ‘ধসিয়ে দেবে’: মার্কিন অর্থমন্ত্রী