হরমুজে মার্কিন চালকবিহীন সাবমেরিন জব্দে উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি চালকবিহীন সাবমেরিন শনাক্ত ও জব্দ করার ঘটনাকে ইরানের নৌ সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরানের দাবি, আধুনিক মার্কিন প্রযুক্তির এই চালকবিহীন সাবমেরিন তাদের হাতে আসায় শুধু সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতারই প্রমাণ মেলেনি, একই সঙ্গে মার্কিন নৌ প্রযুক্তি বিশ্লেষণেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে মার্কিন ডাইভ-এলডি চালকবিহীন সাবমেরিনটি জব্দ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ঘটনাটি স্বীকার করে বলা হয়েছে, যানটি পুরোনো মডেলের এবং এতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা শ্রেণিবদ্ধ সরঞ্জাম ছিল না বলেও দাবি করেছে ওয়াশিংটন।

তবে বিষয়টির গুরুত্ব শুধু একটি চালকবিহীন সাবমেরিনের আর্থিক মূল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অভিযানে চালকবিহীন ব্যবস্থার ব্যবহারের গুরুত্ব উঠে এসেছে। সমুদ্রতলের অনুসন্ধান, মাইন শনাক্ত ও অপসারণ এবং সামুদ্রিক নজরদারির মতো কাজে এসব ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এগুলোকে নিছক পরীক্ষামূলক সরঞ্জাম হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ। এই জলপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন ও টহল বিমানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে চালকবিহীন প্রযুক্তির মাধ্যমেও ওই অঞ্চলে নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

চালকবিহীন সাবমেরিনের বিশেষত্ব হলো, এগুলো পানির নিচে দীর্ঘ সময় তুলনামূলক কম দৃশ্যমানভাবে কাজ করতে পারে। সমুদ্রের তলদেশ, নৌপথ, পানির নিচের পরিবেশ এবং নির্দিষ্ট সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে এগুলো ব্যবহার করা যায়। নৌযুদ্ধে প্রতিপক্ষের গতিবিধি ও সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ ধরনের তথ্যের কৌশলগত মূল্য রয়েছে।

এই কারণে ডাইভ-এলডি চালকবিহীন সাবমেরিনটির মূল্য প্রায় ২৫ লাখ ডলার হলেও এর প্রকৃত গুরুত্ব তার প্রযুক্তি ও সম্ভাব্য তথ্যের মধ্যে। একটি বাস্তব সামরিক যান হাতে পেলে এর কাঠামো, চালনা ব্যবস্থা, সেন্সর, যোগাযোগ সরঞ্জাম, শক্তি ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক প্রযুক্তিগত বিন্যাস বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ডাইভ-এলডি সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি, মাইন শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পানির নিচের অবকাঠামো পরিদর্শনের মতো কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি।

এসব বিশ্লেষণ একই ধরনের দেশীয় প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে কোনো দেশের জন্য সহায়ক হতে পারে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান অতীতে জব্দ করা মার্কিন চালকবিহীন প্রযুক্তি থেকে প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও সেগুলোর অনুকরণ করার চেষ্টা করেছে। ফলে এবারও তেহরানের হাতে থাকা যানটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ডাইভ-এলডি পুরোনো এবং ত্রুটিপূর্ণ ছিল। কোনো সামরিক সরঞ্জামই পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত নয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যবহারের জন্য অনেক চালকবিহীন ব্যবস্থা এমনভাবেই তৈরি করা হয়, যাতে প্রয়োজনে সেগুলো হারানোর ঝুঁকি নেওয়া যায়। কিন্তু কোনো সরঞ্জাম হারানোর ঝুঁকি রয়েছে বলেই সেটি কৌশলগতভাবে মূল্যহীন, এমনটা বলা যায় না।

চালকবিহীন প্রযুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো এমন ঝুঁকিপূর্ণ মিশন পরিচালনা করা, যেখানে ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জাম বা মানুষের জীবন সরাসরি ঝুঁকিতে ফেলা অনাকাঙ্ক্ষিত। ফলে কোনো চালকবিহীন সাবমেরিনকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো হয়ে থাকলে, সেটি বরং ওই মিশনের গুরুত্বেরই ইঙ্গিত দিতে পারে।

ইরানের জন্য ঘটনাটির গুরুত্ব দুই দিক থেকে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তির একটি চালকবিহীন সাবমেরিন এমন একটি সামুদ্রিক পরিবেশে শনাক্ত ও জব্দ করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে তেহরান। দ্বিতীয়ত, হাতে পাওয়া যানটি বিশ্লেষণ করে নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং একই ধরনের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ ঘটনাকে তাই শুধু একটি সামরিক সরঞ্জাম হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখছে না ইরান। বরং হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা এখন যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র বা সাবমেরিনের পাশাপাশি চালকবিহীন প্রযুক্তি ও তথ্যের নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়েও বিস্তৃত হয়েছে।

ওয়াশিংটন চালকবিহীন সাবমেরিনটিকে পুরোনো ও গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরলেও ইরানের হাতে একটি বাস্তব মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি চলে যাওয়ার গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত প্রভাব পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত জলপথে যুক্তরাষ্ট্র কেন এ ধরনের ব্যবস্থা মোতায়েন করেছিল, সেই প্রশ্নও ঘটনাটির গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত চালকবিহীন সাবমেরিনটির মূল্য কত, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি চালকবিহীন সামরিক প্রযুক্তির বাস্তব নমুনা হাতে পেয়েছে। সেটি পুরোনো মডেল হলেও এর নকশা, প্রযুক্তিগত কাঠামো ও কার্যপ্রণালি সম্পর্কে পাওয়া জ্ঞান ভবিষ্যতে তেহরানের নিজস্ব নৌ প্রযুক্তি এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন