জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে উগ্র ডানপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) নির্বাচনে জিততে পারে, এমন আশঙ্কায় অনেক অভিবাসী এখন দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলটি ক্ষমতায় গেলে অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত বহিষ্কার এবং ‘রিমিগ্রেশন’ কার্যক্রম চালানোর যে হুমকি দিয়েছে, তাতেই এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জার্মানির সাবেক কমিউনিস্ট শাসিত এই রাজ্যে আগামী সপ্তাহে নির্বাচন। জনমত জরিপে এএফডি বড় ধরনের জয় পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি রাজ্যে প্রথমবারের মতো এককভাবে সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আশাও করছে দলটি।
এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন সিরিয়ায় জন্ম নেওয়া হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আইমান আলিউসুফ। ২০১৪ সালে জার্মানিতে আসা আলিউসুফ এখন দেশটির নাগরিক। পূর্বাঞ্চলের কুয়েডলিনবুর্গ শহরের একটি ক্লিনিকে প্রধান চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন তিনি।
আলিউসুফ বলেন, তিনি রোগী ও সহকর্মীদের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেয়েছেন। কিন্তু রাস্তায় কখনো কখনো তাকে বৈরী আচরণের মুখে পড়তে হয়। একই অভিজ্ঞতা হয়েছে তার স্ত্রী ও মেয়েরও। তারা মুসলিমদের প্রচলিত মাথার কাপড় পরেন।
তার কথায়, রাতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে এলে তিনি জরুরি চিকিৎসা দিয়ে তাদের জীবন বাঁচাতে পারেন। চিকিৎসার পর রোগীরা যখন জানতে পারেন একজন বিদেশি তাদের সাহায্য করেছেন, তখন তারা কৃতজ্ঞতা জানান। কিন্তু রাস্তায় মানুষ তাকে চিকিৎসক হিসেবে চেনে না; শুধু একজন বিদেশি হিসেবে দেখে।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের আরও অনেক অভিবাসীর মধ্যেও একই ধরনের ভয় কাজ করছে। গত সপ্তাহে রাজ্যের রাজধানী ম্যাগডেবুর্গে অভিবাসীদের পরিচালিত প্রায় ১৫০টি রেস্তোরাঁ, দোকান ও নরসুন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। ক্রমবর্ধমান বিদেশিবিদ্বেষের প্রতিবাদেই তারা এ কর্মসূচি নেয়।
শরণার্থী সহায়তা সংগঠন রিফিউজি কাউন্সিল জানিয়েছে, অনেক অভিবাসী ইতোমধ্যে বর্ণবাদ ও সামাজিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ব্যাপক বহিষ্কারের আলোচনা তাদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
আফগানিস্তান থেকে আসা ২৪ বছর বয়সী রেজওয়ান তালাশও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ছয় বছর আগে জার্মানিতে আসা তালাশ ম্যাগডেবুর্গের একটি কম্পিউটার মেরামতের দোকানে কাজ করেন। তার ভাষ্য, নির্বাচনের পর জীবন আগের মতো থাকবে কি না-এই প্রশ্ন সবসময় তার মনে কাজ করছে।
তালাশ জানান, তাদের সংগঠনের কয়েকজন স্যাক্সনি-আনহাল্ট ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। নির্বাচনের পর এখানে নিজেদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নাও থাকতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তারা চলে গেছেন বলে জানান তিনি।
এএফডির শীর্ষ প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে চান। তিনি বলেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই বৈধ কাগজপত্র ছাড়া থাকা বিদেশিদের বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে কঠোর শর্ত মেনে নিয়মিত অভিবাসন নিয়ে তার দলের আপত্তি নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এরই মধ্যে সমাজে বিভাজন বাড়িয়েছে বলে মনে করেন বামপন্থী গ্রিনস দলের প্রার্থী মামাদ মোহামাদ। হালের একটি ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বাইরে প্রচারণার সময় তিনি জানান, কেউ কেউ তাদের সঙ্গে কথা বললেও অনেকে গালি দেন বা চিৎকার করে চলে যান।
সিরিয়া থেকে ১৯৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে জার্মানিতে আসা ইয়াজিদি কুর্দি মোহামাদ বলেন, প্রচারে বের হলে তাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। তারা সাধারণত তিন-চারজনের দল হয়ে শহরে প্রচার চালান।
অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ১৯৯০ সালে জার্মানির পুনঃএকত্রীকরণের পর থেকে স্যাক্সনি-আনহাল্টের জনসংখ্যা প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মক্ষেত্র থেকে যে হারে মানুষ বের হচ্ছেন, সেই তুলনায় নতুন কর্মী যোগ দিচ্ছেন অর্ধেক হারে।
রাজ্যের কনজারভেটিভ সিডিইউ দলের প্রার্থী সভেন শুলৎসে বলেন, কর্মক্ষেত্রে প্রতি দুজন মানুষ চলে গেলে নতুন করে মাত্র একজন যোগ দিচ্ছেন। স্থানীয় জনগোষ্ঠী দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীরাও দক্ষ কর্মীর সংকটের কথা বলছেন। তালাশের কর্মস্থলের মালিক ম্যাথিয়াস হারবার্গ বলেন, স্যাক্সনি-আনহাল্টে তরুণ ও দক্ষ কর্মী খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার মতে, অভিবাসী পরিবারের যোগ্য কর্মীরা এই ঘাটতি পূরণ করতে পারেন।
স্বাস্থ্য খাতেও অভিবাসীদের ওপর নির্ভরতা বেশি। কুয়েডলিনবুর্গের ক্লিনিক পরিচালক ম্যাথিয়াস ফথ বলেন, বিদেশে জন্ম নেওয়া দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সদের ছাড়া তাদের হাসপাতাল চালানো সম্ভব নয়। তাদের চলে যেতে হলে হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে হতে পারে।
আইমান আলিউসুফ এখনই স্যাক্সনি-আনহাল্ট ছাড়তে চান না। তবে পরিস্থিতি বদলে গেলে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার সুযোগ তিনি খোলা রেখেছেন। তার ভাষায়, জার্মান পাসপোর্ট থাকায় তিনি শুধু এই রাজ্য বা জার্মানির অন্য রাজ্যেই নয়, চাইলে অন্য দেশেও কাজ করতে পারবেন। এখানে যদি বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা আরও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তিনি আর থাকতে চাইবেন না।
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে পরমাণু যুদ্ধের ময়দান ভাবছে: রাশিয়া
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি না দিলে হরমুজ বন্ধ
ফিলিস্তিনি বন্দীদের দুর্দশা বাড়িয়ে গর্বিত বেন গাভির
পশ্চিম তীরে বেড়েই চলেছে শিশু হত্যা
পাকিস্তানে হাসপাতালে আগুনের ঘটনায় ৮ কর্মকর্তা বরখাস্ত