যুদ্ধের ময়দানে মানুষের বদলে ধীরে ধীরে রোবট নামানোর দিকে এগোচ্ছে ইউক্রেন। রুশ বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জনবলের ঘাটতি সামাল দিতে দেশটি এখন অস্ত্রবাহী ও সরঞ্জাম পরিবহনকারী চালকবিহীন স্থলযানকে সামনে ঠেলে দিচ্ছে। ইউক্রেনের তৃতীয় আর্মি কোরের একটি ইউনিট ঘুরে দেখা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যুদ্ধের এই নতুন বাস্তবতা।
উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের সম্মুখসারির কাছে একটি ছোট কর্মশালায় সামরিক মেকানিক ‘কাইমেরা’ তখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছেন একের পর এক চার চাকার চালকবিহীন যান। ‘হায়েনা’ নামে পরিচিত এসব যান বিস্ফোরক নিয়ে রুশ অবস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, শত্রুর বাংকারে হামলা চালাতে পারে কিংবা অগ্রসরমান সেনাদের থামাতে ব্যবহার করা যায়।
৪৪ বছর বয়সী কাইমেরা বলেন, এসব যানে প্রায় ২০ কেজি বিস্ফোরক বহন করা সম্ভব। একই ধরনের স্থলযান ব্যবহার করে রুশ সেনাদের আত্মসমর্পণ করানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান তিনি।
ইউক্রেনের প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সম্মুখসারিজুড়ে এখন এমন কর্মশালা গড়ে উঠছে। জনবলে পিছিয়ে থাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ পদাতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করছে। আকাশজুড়ে ড্রোনের উপস্থিতিতে যুদ্ধক্ষেত্র এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ফলে সেনাদের জীবন বাঁচিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চালকবিহীন স্থলযানকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে কিয়েভ।
ইউক্রেনের অধিকাংশ ব্রিগেড ও রেজিমেন্টেই এখন চালকবিহীন ব্যবস্থার জন্য আলাদা ইউনিট রয়েছে। এসব ইউনিটে আকাশপথের ড্রোনের পাশাপাশি স্থল ড্রোনও যুক্ত করা হচ্ছে।
যুদ্ধের ‘পরবর্তী বিপ্লব’
ইউক্রেনের তৃতীয় আর্মি কোরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আন্দ্রি বিলেতস্কি পদাতিক সেনাদের জায়গায় ধীরে ধীরে চালকবিহীন স্থলযান ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে যুদ্ধের পরবর্তী ‘বিপ্লব’ হিসেবে দেখছেন।
ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাহিনী চলতি বছরের শেষ নাগাদ সম্মুখসারির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সেনার কাজ স্থল ড্রোন দিয়ে করানোর লক্ষ্য নিয়েছে। বিলেতস্কির দাবি, আকাশপথের ড্রোন বিপ্লবের গুরুত্ব পশ্চিমা দেশগুলো অনেকাংশে সময়মতো বুঝতে পারেনি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধের পরবর্তী পরিবর্তনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
দোনেৎস্কের পূর্বাঞ্চলীয় ‘দুর্গ বলয়’-এর মতো সম্মুখসারি এলাকায় ইতোমধ্যেই স্থল ড্রোনকে খাদ্য ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতে এবং আহত সেনাদের সরিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি বছর এসব যান দিয়ে ৫০ হাজারের বেশি সরবরাহ ও আহত সেনা উদ্ধারের অভিযান চালানো হয়েছে।
‘লোহার তৈরি যোদ্ধা’
খারকিভ অঞ্চলের একটি ভূগর্ভস্থ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে তৃতীয় আর্মি কোরের এনসি১৩ ইউনিটের সদস্যরা কম্পিউটার ও নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের সামনে বসে স্থল ড্রোন পরিচালনা করছেন। গত বছর গঠিত এই ইউনিটটি নিয়মিতভাবে স্থল ড্রোন ব্যবহার করে অভিযান চালাচ্ছে।
কখনো একটি ট্রেলারে বোমা তুলে তা শত্রুর রসদ পরিবহনের সেতুতে নিয়ে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। আবার কখনো মেশিনগানযুক্ত স্থল ড্রোন রুশ আক্রমণ ঠেকিয়ে রেখেছে, আর একই সময়ে ওপর থেকে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইউনিটটির উপ-অধিনায়ক ‘বার’ বলেন, স্থল ও আকাশ ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করা অত্যন্ত কার্যকর সমন্বয়। তবে স্থল ড্রোনের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এগুলো কঠিন বাধা পার হতে সমস্যায় পড়ে এবং পদাতিক সেনাদের মতো ভবন বা পরিখা পরিষ্কার করতে পারে না। আকাশ ড্রোনের মতো বিপুল সংখ্যায় এগুলো উৎপাদন করাও এখনো সম্ভব হচ্ছে না।
তারপরও এসব যানের বড় সুবিধা হলো, তাদের খাবার, পানি কিংবা আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই। ফলে মানুষের জন্য বিপজ্জনক অনেক কাজ এখন যন্ত্র দিয়ে করানো সম্ভব হচ্ছে।
মানুষ সরিয়ে যুদ্ধের নতুন কৌশল
বিলেতস্কির মতে, স্থল ড্রোন যুদ্ধকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার কোনো জাদুকরী অস্ত্র নয়। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তারের এটি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণের সঙ্গে স্থল ড্রোন যুক্ত হলে কমান্ডারদের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি সময় ও সুযোগ তৈরি হবে।
তার ধারণা, মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি কমলে কমান্ডাররা এমন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনার সাহস পাবেন, যা আগে বিপুল সেনা হতাহতের আশঙ্কায় এড়িয়ে যেতে হতো। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ একটি সৃজনশীল কাজ; কমান্ডারের কাজ হলো কৌশল তৈরি করা, শুধু মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া নয়।
ইউনিটটির উপ-অধিনায়ক বার নিজেও একসময় পদাতিক সেনা ছিলেন এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের আগের বড় লড়াইগুলোতে এ ধরনের স্থল ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে তাঁর বহু সহযোদ্ধা হয়তো আজও বেঁচে থাকতেন। সূত্র: রয়টার্স
কূটনৈতিক সাফল্য তেলের দামে মাপা যায় না: বাঘাই
ব্রিকস ব্যাংকে সদস্যপদ পেতে বাধা দূর করছে ইরান: আরাঘচি
সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই: বাঘাই
সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলা, যৌথ তদন্তে ইরাক-ইরান