যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

নাচ, বক্সিং আর দৌড়ের প্রতিযোগিতা পেরিয়ে এবার যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য মানবসদৃশ রোবট প্রস্তুত করছে চীন। দেশটির সামরিক গবেষকেরা এসব রোবটকে ভবিষ্যতে যুদ্ধের ময়দানে মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। রয়টার্সের শতাধিক সামরিক ক্রয় বিজ্ঞপ্তি, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট, সরকারি নথি ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।

গত মাসে চীনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবসদৃশ রোবট গেমসে রোবটগুলো দৌড়েছে, বক্সিং করেছে, নাচ করেছে। এমনকি কিছু রোবট ১০০ মিটার দৌড়ে উসাইন বোল্টের রেকর্ড গতির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিন পরই চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সরকারি সংবাদপত্র এই প্রযুক্তিকে যুদ্ধের ময়দানে নেওয়ার আহ্বান জানায়।

পিএলএ ডেইলি গবেষণাগার থেকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রে স্থানান্তর করে রোবট যোদ্ধাদের প্রস্তুত করার ওপর জোর দেয়। রয়টার্সের পর্যালোচনা বলছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে মানবসদৃশ রোবট নিয়ে চীনের সামরিক গবেষণায় গতি বেড়েছে। রোবটের পরিবেশ শনাক্তকরণ, বিভিন্ন বস্তু ধরার সক্ষমতা এবং প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চীনা সামরিক গবেষণায় এরই মধ্যে নগরযুদ্ধের একটি সম্ভাব্য চিত্রও তৈরি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির গবেষকেরা এমন একটি অভিযানের মডেল তৈরি করেন, যেখানে ছয়টি রোবটকে দুটি আক্রমণকারী দলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। মানবসেনাদের সঙ্গে কাজ করে এসব রোবট শত্রুর দখলে থাকা ভবন তলা ও কক্ষ ধরে ধরে পরিষ্কার করবে, এমন পরিস্থিতি সেখানে বিবেচনা করা হয়।

শুধু ভবনে অভিযান নয়, শত্রুর প্রতিরক্ষা ভেদ করে তাদের পেছনে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনাও চীনা সামরিক গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জুনে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির একটি প্রতিযোগিতায় রোবটকে শত্রুপক্ষের লাইনের পেছনে প্রবেশ, এলাকা শনাক্তকরণ এবং লক্ষ্য খুঁজে বের করার মতো কাজের অনুকরণ করতে দেওয়া হয়।

চীনা সামরিক বাহিনীর আগ্রহ এখন শুধু রোবটের শরীর তৈরিতে সীমাবদ্ধ নেই। চলতি বছরের জুনে পিএলএ প্রায় ৩০ লাখ ডলার নয়, প্রায় ৩০ কোটি ডলার সমমূল্যের একটি নয়, প্রায় ৩ লাখ ডলারের একটি ব্যবস্থা তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দ করে। এর মাধ্যমে মানবসদৃশ রোবটের জন্য ক্যামেরা, রাডার ও গতিবিধির তথ্য সংগ্রহ ও শ্রেণিবদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়। কোন ধরনের ভূখণ্ডে রোবট চলতে পারবে, সেই তথ্যও এর আওতায় রাখা হয়েছে।

চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পও এখন এই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নরিনকোর তৈরি ফুসি নামের মানবসদৃশ রোবটকে প্রহরা, সব আবহাওয়ায় নজরদারি, টহল এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য বলছে। রোবটটিকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে একজন মানুষ সরাসরি এর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে মানবসদৃশ রোবট ব্যবহারের পথে বড় বাধাও রয়েছে। বর্তমানে এসব রোবট প্রচুর শক্তি ব্যবহার করে এবং নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনীর বাইরে তাদের নির্ভরযোগ্যতা এখনও সীমিত। অনিশ্চিত যুদ্ধক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা, পরিবেশ শনাক্ত করা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।

তারপরও সামরিক গবেষকেরা সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। চীনা সামরিক বিজ্ঞান একাডেমির এক গবেষক লিখেছেন, চলাচল, পরিবেশ শনাক্তকরণ ও বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে এবং উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে ব্যাপক উৎপাদন সম্ভব হলে মানবসদৃশ রোবট সামরিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

তখন বিনোদনের মঞ্চে নাচা বা বক্সিং করা রোবটের জায়গা হতে পারে যুদ্ধক্ষেত্র। চীনের সামরিক গবেষণায় সেই সম্ভাবনার দিকেই এখন ধীরে ধীরে এগোনোর ইঙ্গিত মিলছে। সূত্র: রয়টার্স

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত