মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিরোধিতা করে তিনি সতর্ক করেছেন, এমন পদক্ষেপ মস্কোকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে পুতিন যে যুদ্ধ বন্ধ করতে আন্তরিক, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন জেলেনস্কি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) কিয়েভ থেকে সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ এবং মস্কোর ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগের মধ্যেই ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট করেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, বিষয়টি ব্যক্তিগত সম্পর্কের নয়; বরং রাশিয়ার বিরুদ্ধে কী ধরনের নীতি নেওয়া হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জেলেনস্কির ভাষ্য, পুতিনের প্রতি তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে পুতিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন। তাই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিরোধিতা করছেন তিনি। এর আগে রাশিয়ার জ্বালানি কেনার বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার পর জেলেনস্কি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইতিহাসের ভুল পাশে অবস্থান করছেন বলে মন্তব্য করেছিলেন। রাশিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তও সমালোচনার জন্ম দেয়।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এর আগের দিন নরওয়েতে জেলেনস্কির সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়। পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর উইটকফ রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করে তাঁকে মানবিক ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর এ মন্তব্যও বিতর্ক তৈরি করেছে।
জেলেনস্কি বলেন, নরওয়ের রাজধানী অসলোতে উইটকফের সঙ্গে তাঁর আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে পুতিন সত্যিকার অর্থে শান্তি চান কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তাঁর অভিযোগ, পুতিন অন্য মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন এবং যুদ্ধ থামানোর ইচ্ছা তাঁর নেই। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মতে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের এমন কোনো সুযোগ দেওয়া উচিত নয়, যার মাধ্যমে রাশিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে ইউক্রেনকে পরাজিত করার চেষ্টা করতে পারে।
যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ হিসেবে বর্তমান সম্মুখসারির অবস্থান ধরে রেখে যুদ্ধবিরতির বিষয়েও কথা বলেছেন জেলেনস্কি। তাঁর মতে, হত্যাযজ্ঞ থামিয়ে আলোচনায় বসার জন্য সামনের সারির অবস্থান স্থির রাখার উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। একই সঙ্গে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় অঞ্চলগুলোকে মস্কোর ভূখণ্ড হিসেবে কখনো স্বীকৃতি দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের ভূখণ্ডের গুরুত্ব শুধু আয়তন বা মানচিত্রের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে। দেশের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড রক্ষায় বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। তাই দখল করা অঞ্চলগুলোর বিষয়ে ইউক্রেনের অবস্থান বদলাবে না বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের আরেকটি কারণ ছিল গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, স্টারলিংক সেবা এবং অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে জটিলতা। জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আবার শুরু হয়েছে। তবে স্পেসএক্সের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ডের সেবা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা পেলেও সেগুলো প্রতিহত করার মতো ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি ইউক্রেনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপীয় মিত্ররা ইউক্রেনকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র দিলেও তা আত্মরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। মিত্রদের কাছে তাঁর প্রধান দুটি প্রত্যাশা, পুতিনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা এবং ইউক্রেনকে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়টি অস্বীকার করলেও রাশিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সহায়তা নিয়ে কিয়েভের উদ্বেগ এখনো কাটেনি। সূত্র: সিএনএন
শান্তি আলোচনায় পুতিনের সম্মতির পরই কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা উচিত হয়নি: পিটার থিয়েল
ইরানের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কূটনীতিতে বাধা দাবি করায় তেহরানের সমালোচনা