মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ থেকে ১৫০ ডলারে ওঠার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যখন পশ্চিমা বিশ্ব এবং তেল আমদানিকারক দেশগুলো জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, তখন বেইজিংয়ের চিত্রটা একদম উল্টো। তথ্য বলছে, এই ধরণের সংকটের পূর্বাভাস পেয়ে চীন গত এক বছর ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের ‘অয়েল গেম’ সাজিয়েছে।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই চীন তাদের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে আসছিল। কাস্টমস ও শিপিং ডেটা অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই চীন প্রতিদিন প্রায় ১২.৪ লাখ ব্যারেল বাড়তি তেল মজুদ করেছে। মজার ব্যাপার হলো, এই তেলের সিংহভাগই এসেছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পাওয়া রাশিয়া, ইরান এবং ভেনেজুয়েলা থেকে। যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলারের আশেপাশে ছিল, চীন তখন সস্তায় এই তেলের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।
গত এক দশকে চীন দুটি স্তরে তাদের তেল মজুদের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। একদিকে সরকারের কৌশলগত রিজার্ভ (SPR), অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর বিশাল বাণিজ্যিক ট্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই বিশাল ভাণ্ডারে বর্তমানে ১১০ থেকে ১২০ কোটি (১.১-১.২ বিলিয়ন) ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে। এই মজুদের বড় অংশই রাখা হয়েছে মাটির নিচে অত্যন্ত সুরক্ষিত বিশাল সব গুহায়।
বর্তমানে তেলের দাম যখন ৯০ ডলার ছাড়িয়ে ১০০-এর দিকে ছুটছে, চীন তখন তাদের সস্তায় কেনা তেল ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখছে। অন্যদিকে, ভারত বা ইউরোপের দেশগুলোকে এখন চড়া দামে বাজার থেকে তেল কিনতে হচ্ছে। এতে করে বিশ্ব বাণিজ্যে চীন এক বিশাল প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা (Arbitrage) ভোগ করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন এখন কেবল তেলের বড় ক্রেতাই নয়, বরং তারা এখন দাম নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও রাখে। চীন যদি এখন বিশ্ববাজার থেকে তেল কেনা কমিয়ে দিয়ে তাদের নিজস্ব মজুদ ব্যবহার শুরু করে, তবে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমে যেতে পারে। আবার তারা যদি মজুদ বাড়াতে থাকে, তবে দাম আকাশচুম্বী হবে। ওপেকের (OPEC) দেশগুলো বা পশ্চিমা নীতি নির্ধারকদের জন্য চীনের এই ‘অস্বচ্ছ’ তেলের মজুদ এখন এক বিশাল মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিণামে দেখা যাচ্ছে, ইরান সংকটের সঠিক সময় বেইজিং জানুক বা না জানুক, তেলের বাজার যে অস্থির হবে সেটি তারা আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিল। আর সেই প্রস্তুতিই এখন চীনকে বিশ্ব রাজনীতির এক শক্তিশালী অবস্থানে বসিয়ে দিয়েছে।
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে চীনের হস্তক্ষেপ জরুরি: উইলিয়াম লি
