পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছে। দেড় দশকের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো নবান্নের পথে দাপটের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে বিজেপি। প্রাথমিক ফলাফল ও প্রবণতা অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি গরিষ্ঠতা নিয়ে গেরুয়া শিবির ক্ষমতায় আসতে চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্রেফ প্রচার নয়, বরং পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ফ্যাক্টর বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।
বিজেপির এই সাফল্যের পেছনের কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. নারী ভোটব্যাংকে ফাটল ও ‘আরজি কর’ ইস্যু
পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি নারী। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের কারণে এই ভোটব্যাংক এতদিন তৃণমূলের রক্ষাকবচ ছিল। কিন্তু দুই বছর আগে আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক ‘অভয়া’র ওপর নৃশংস নির্যাতন ও খুনের বিচার না পাওয়ার ক্ষোভ নারীদের দলটির প্রতি বিমুখ করেছে। এর প্রমাণ মেলে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি পানিহাটিতেও, যেখানে আরজি করের নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।
২. ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ নাম বাদ
নির্বাচন কমিশনের ‘এসআইআর’ বা নিবিড় সংশোধনের ফলে রাজ্য জুড়ে প্রায় ৯০ লাখ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিজেপি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল, তৃণমূল ভুয়া ও মৃত ভোটারদের ব্যবহার করে নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা নিত। তালিকা থেকে এই বিপুল সংখ্যক নাম কাটা পড়ায় তৃণমূল সাংগঠনিকভাবে বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে, যা বিজেপির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ ও বেকারত্ব
টানা ১৫ বছরের শাসনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কাটমানি এবং ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর অভিযোগ আকাশচুম্বী হয়েছিল। এছাড়া শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের চরম ব্যর্থতা যুবসমাজের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি করে। ভোটের আগে বেকারদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা চালু করেও এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব হয়নি।
৪. হিন্দু ভোটের মেরুকরণ ও মুসলিম সমর্থনে ফাটল
তৃণমূলের জয়ের মূল ভিত্তি ছিল রাজ্যের ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট। কিন্তু এবার হিন্দু ভোটারদের একটি বিশাল অংশ বিজেপির দিকে একাট্টা হয়েছে। এমনকি মুসলিম প্রধান জেলা মালদা ও মুর্শিদাবাদেও বিজেপি বেশ কিছু আসন ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। মমতার মন্দির নির্মাণ বা ‘সফট হিন্দুত্ব’ নীতি শেষ পর্যন্ত বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদের কাছে পরাজিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৫. নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কঠোর ভূমিকা
অতীতে রাজ্যের শাসক দল প্রশাসনের মাধ্যমে যে ধরণের বাড়তি সুবিধা পেত, এবার তা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। নির্বাচন ঘোষণার পরপরই কমিশন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের ঢালাওভাবে বদলে দেয়। এছাড়া ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। ফলে মানুষ ভয়ভীতিহীন পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন, যা কার্যত তৃণমূলের বিরুদ্ধে গেছে।
আজ মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেল ৪টায় কালীঘাটে সংবাদ সম্মেলন করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি এই পরাজয় বা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার পরবর্তী অবস্থান পরিষ্কার করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা।
বিজেপির জয়ের পর রণক্ষেত্র পশ্চিমবঙ্গ