বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে সোনার বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে। জার্মানিভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক–ডয়েচে ব্যাংকের মতে, বিভিন্ন দেশ তাদের সংরক্ষিত সম্পদের (রিজার্ভ অ্যাসেট) ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্রমাগত সোনার দিকে ঝুঁকতে থাকায়, এই মূল্যবান ধাতুটি বিশেষভাবে লাভবান হবে।
গত সোমবার প্রকাশিত এক গবেষণা নোটে জার্মানির এই বিনিয়োগ ব্যাংকটি জানিয়েছে, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, আর্থিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে সোনার মজুদ বাড়িয়ে চলেছে।
ব্যাংকটি উল্লেখ করেছে যে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভে ২২ কোটি ৫০ লাখ আউন্সেরও বেশি স্বর্ণ যুক্ত করেছে। বিপরীতে, তাদের রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশ ২০০০ সালের শুরুর দিকের ৬০ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সোনা মজুদের এই দৌড়ে কেবল চীন, রাশিয়া, ভারত এবং তুরস্কের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোই নয়, বরং কাজাখস্তান, সৌদি আরব, কাতার, মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও এখন ব্যাপকভাবে সোনা কিনছে বলে ডয়েচে ব্যাংক পর্যবেক্ষণ করেছে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভে সোনার হার বর্তমানের ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ব্যাংকটি পূর্বাভাস দিয়েছে। এই বরাদ্দের ভিত্তিতে ডয়েচে ব্যাংক একটি সিমুলেশন বা কৃত্রিম মডেল পরিচালনা করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৮ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি।
যদিও দামের এই প্রাক্কলনটি মূলত একটি তাত্ত্বিক ধারণা এবং কোনো আনুষ্ঠানিক পূর্বাভাস নয়, তবুও এটি বিশ্বজুড়ে চলমান 'ডি-ডলারাইজেশন' বা অর্থনীতিকে ডলারমুক্ত করার বিভিন্ন দেশের প্রচেষ্টার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। মার্কিন সম্পদের ওপর থেকে বিশ্ববাজারের আস্থা কমতে থাকায় সোনাই যে এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে, সেই প্রচলিত ধারণারই বহিঃপ্রকাশ এটি।
গত বছর ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের এক জরিপে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের সোনা মজুদের সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা মূলত গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার ধারাবাহিকতা। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সোনার দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ফলে গত জানুয়ারিতে সোনার দাম যে রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল, সাম্প্রতিক এই অস্থিতিশীলতায় সেই অর্জনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই হারিয়েছে ধাতুটি।
