কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। দেশটির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ চুক্তির সম্ভাবনা "খুব বেশি নেই" বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ গঠনের একদিন পরই তিনি এই মন্তব্য করলেন।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাথে একটি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে বর্তমান কিউবান নেতৃত্বের চরিত্র বিবেচনায় সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিউবা এই অঞ্চলের "সন্ত্রাসবাদের অন্যতম বড় মদদদাতা"।
"আমি আপনাদের সাথে সৎ থাকতে চাই, আমরা এখন যাদের মোকাবিলা করছি, তাদের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়," সাংবাদিকদের বলেন রুবিও।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি রুবিওকে "মিথ্যাবাদী" হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, কিউবা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি ছিল না।
রদ্রিগেজ আরও অভিযোগ করেন, রুবিও মূলত সামরিক আগ্রাসনের উসকানি দিচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে কিউবার ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।
মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে তার দেশকে "নিষ্ঠুর ও পদ্ধতিগতভাবে" ক্ষতিগ্রস্ত করারও অভিযোগ করেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে দুটি বিমান ভূপাতিত করে মার্কিন নাগরিক হত্যার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন হলো- তাকে কীভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হবে?
সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জানতে চাইলেও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো কৌশল উল্লেখ করেননি।
রুবিও বলেছেন, "আমরা তাকে কীভাবে এখানে আনব সে বিষয়ে আমি আলোচনা করব না। যদি আমরা তাকে আনার চেষ্টা করি, তবে আমি কেন গণমাধ্যমের কাছে আমাদের পরিকল্পনা ফাঁস করব?"
তবে বুধবার মিয়ামিতে এই অভিযোগ ঘোষণা করা ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন আশা করছে রাউল কাস্ত্রো নিজে থেকেই অথবা অন্য কোনো উপায়ে মার্কিন আদালতে হাজির হবেন।
পর্যবেক্ষকরা এই বিষয়টিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কঠোর পদক্ষেপের সাথে তুলনা করছেন।
এমন একটি সময় যুক্তরাষ্ট্র এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে যখন ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ও খাদ্য ঘাটতির কারণে কিউবার জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। মার্কিন অবরোধের ফলে দেশটিতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে কিউবার নাগরিকরা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন। আর এর মধ্যেই দেশটির ওপর চুক্তি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এই প্রেক্ষাপটে রুবিও দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে ১০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তার যে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটি গ্রহণ করেছে হাভানা।
একই সাথে, কিউবার প্রভাবশালী সামরিক নিয়ন্ত্রিত সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তার বোনকে গ্রেফতারের কথাও জানিয়েছেন রুবিও।
"যুক্তরাষ্ট্র আডিস লাস্ট্রেস মোরেরাকে গ্রেফতার করেছে, যিনি কিউবার শীর্ষ একজন সামরিক কর্মকর্তার বোন," সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ জানান রুবিও।
ওই কর্মকর্তা জিএইএসএ নামে পরিচিত কিউবান সামরিক বাহিনী পরিচালিত একটি বড় গোষ্ঠী, যেটি কিউবার অর্থনীতির অধিকাংশ লাভজনক অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, এর সদস্য বলেও তিনি দাবি করেন।
রুবিও আরো দাবি করেন, মোরেরা "হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে সহায়তা করার পাশাপাশি" ফ্লোরিডায় বসবাস করছিলেন।
তাকে অভিবাসন বিভাগ গ্রেফতার করেছে এবং তার নির্বাসন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি হেফাজতে থাকবেন বলেও জানান রুবিও।
এদিকে, ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় কিউবাকে একটি "ব্যর্থ রাষ্ট্র" হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি বলেছেন যে, তার প্রশাসন "মানবিক ভিত্তিতে" কিউবাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। কিউবান-আমেরিকানরা "তাদের দেশে ফিরে যেতে এবং কিউবার সাফল্যে সহায়তা করতে"।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, "অন্যান্য প্রেসিডেন্টরা গত ৫০-৬০ বছর ধরে বিষয়টি দেখেছেন, কিন্তু মনে হচ্ছে এবার আমিই এটি সমাধান করব, তাই আমি এটি করতে পেরে খুশি হবো।"
এদিকে, কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনার মার্কিন সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রের বিরুদ্ধে "জবরদস্তি" এবং "হুমকি" বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে ক্রেমলিন বলেছে, হাভানার ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা "সহিংসতার কাছাকাছি" পৌঁছেছে।
১৯৯৬ সালে দুটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৯৫ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। ওই ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছিলেন, যা ওয়াশিংটন ও কিউবার মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মতপার্থক্য দূর করার লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ সময়ের মধ্যেই হোয়াইট হাউস হাভানার ওপর চাপ অব্যাহতভাবে বাড়িয়ে গেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন, যার মাধ্যমে কিউবার জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, আর্থিক ও নিরাপত্তা খাতের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এছাড়া, যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘন বা সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ এনেছে, তাদের বিরুদ্ধেও এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
দ্বীপটির কাছাকাছি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ফ্লাইটও নাকি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, গত সপ্তাহে সেখানে সফরকালে সিআইএ পরিচালক দাবি করেন, কিউবা যেন "প্রতিপক্ষদের জন্য আর নিরাপদ আশ্রয়স্থল না থাকে"। সূত্র: বিবিসি বাংলা