নিজে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েও ছেলেকে বাঁচাতে চান মা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

একজন মা নিজেও ক্যান্সারে আক্রান্ত। শরীর প্রতিদিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবুও নিজের জীবন নয়, তার সব চিন্তা একমাত্র সন্তানকে ঘিরে। চিকিৎসার জন্য পরিবারের হাতে থাকা শেষ সম্বলও বিক্রি হয়ে গেছে। এখন অর্থের অভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে মা-ছেলের জীবন।

ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব চতলা (জনতা বাজার) এলাকার হামিদ পাটোয়ারী বাড়ির বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী মোসা. মমতাজ বেগম গত এক বছর ধরে ব্রেস্ট ক্যান্সারে ভুগছেন। ২০২৫ সালের জুন মাসের শুরুতে তার শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ে। অসুস্থ মাকে দেখতে চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে কর্মরত বড় ছেলে মো. জাবের (৩০) চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকায় যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করান। সেই পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তিনিও ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত।

একই মাসে মা-ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর যেন পুরো পরিবারই ভেঙে পড়ে। এরপর শুরু হয় বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। গত এক বছরে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা। সেই অর্থ জোগাতে বিক্রি করতে হয়েছে পরিবারের ৬৪ শতাংশ জমি। এখন বসতভিটা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই।

মমতাজ বেগমের ছোট ছেলে মো. জোবায়ের বলেন, মায়ের ব্রেস্টে একটি ছোট টিউমার দেখা দেওয়ার পর ঢাকায় নিয়ে গেলে ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি শুরু হয়। মায়ের চিকিৎসার মাঝেই বড় ভাই জাবেরের ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ায় পরিবারে নেমে আসে আরও বড় বিপর্যয়।

তিনি জানান, তার মাকে এখন পর্যন্ত আটটি কেমোথেরাপি ও ১৫টি রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জাবেরকে দেশে চারটি কেমোথেরাপি দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে ভারতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দিলেও অর্থাভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে দেশে ফিরে ঢাকার একটি হাসপাতালে একটি ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও তিনটি ইমিউনোথেরাপি প্রয়োজন।

জোবায়ের বলেন, ‘মা ও ভাইয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সব জমি বিক্রি করে ফেলেছি। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও সাহায্য নিয়েছি। এখন আর কোনোভাবেই অর্থ জোগাড় করতে পারছি না। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে আরও অন্তত ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন।’

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, নিজের অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেও মমতাজ বেগম পরিবারের সদস্যদের বারবার বলছেন, তার চিকিৎসায় আর টাকা ব্যয় না করে যেন ছেলের চিকিৎসা করানো হয়।

জোবায়ের আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘মা প্রায়ই বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। আমি আর কতদিন বাঁচব? আমার জন্য টাকা খরচ করো না, জাবেরের চিকিৎসাটা করাও।’ কিন্তু একজন সন্তান হয়ে কীভাবে চোখের সামনে নিজের মাকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখি? আবার ভাইকেও তো হারাতে চাই না। আমরা যেন দুই দিক থেকেই অসহায় হয়ে পড়েছি।’

তিনি আরও জানান, তাদের বাবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও অসুস্থ হওয়ায় অনেক আগে থেকেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন জাবের। গার্মেন্টসে চাকরি করে তিনি পরিবারের সব খরচ চালাতেন। শুধু নিজের পরিবার নয়, সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষদেরও সহযোগিতা করতেন। আজ সেই মানুষটিই নিজের চিকিৎসার জন্য অন্যের সহায়তার মুখাপেক্ষী।

পরিবারটির দাবি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং দেশ-বিদেশের মানবিক মানুষ এগিয়ে এলে মা ও ছেলে দুজনের চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। সহায়তা করতে ইচ্ছুকরা বিকাশ (০১৭২৭০১৩৩০৭) অথবা নগদ (০১৭৯৫০৮০০১৬) নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুদ বলেন, ‘মা-ছেলে দুজনই ক্যান্সারে আক্রান্ত এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদান থেকে যাতে তারা দ্রুত সহায়তা পান, সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

MCH/YA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত