কাঁঠাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু বিস্কুট

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

গাছে গাছে ঝুলছে পাকা কাঁঠাল। বাগানজুড়ে ছড়াচ্ছে মিষ্টি ঘ্রাণ। অথচ ভরা মৌসুমে এই সুস্বাদু ফলের বড় একটি অংশ বিক্রি না হওয়ায় পড়ে থাকে গাছের নিচে, পরে পচে-গলে নষ্ট হয়। বছরের পর বছর ধরে গাজীপুরের কাঁঠালচাষিদের কাছে এ যেন পরিচিত এক চিত্র। এবার সেই চিত্র বদলানোর উদ্যোগ নিয়েছেন শ্রীপুরের এক উদ্যোক্তা। পাকা কাঁঠাল থেকেই তৈরি করছেন বিস্কুট। আর বাজারে আসার পর নতুন স্বাদের এই বিস্কুটে মিলছে বেশ সাড়া।

গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া কাঁঠালের অপচয় রোধ ও বহুমুখী ব্যবহারের চিন্তা থেকে শুরু করেছেন ‘কাঁঠাল বিস্কুট’ উৎপাদন। কোনো কৃত্রিম ফ্লেভার ছাড়াই কাঁঠালের রস, ঘি, বাটার, দুধ, ময়দাসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে এ বিস্কুট। অনলাইনে বাজারজাত শুরু হওয়ার পর এর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।

নতুন এই উদ্যোগে আশার আলো দেখছেন স্থানীয় কাঁঠালচাষিরাও। তাঁদের প্রত্যাশা, কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে বছরজুড়ে বাজারজাত করা গেলে ভরা মৌসুমে কম দামে বিক্রি কিংবা বাগানে ফল নষ্ট হওয়ার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে কাঁঠালের ন্যায্যমূল্যও পাওয়া সম্ভব হবে।

গাজীপুরকে বলা হয় কাঁঠালের জেলা। জেলার উৎপাদিত কাঁঠালের বড় অংশই আসে শ্রীপুর উপজেলা থেকে। এই উপজেলায় যার জমি আছে, তাঁর কাঁঠালগাছ নেই এমনটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। উঁচু লাল মাটির কারণে শ্রীপুরের কাঁঠাল সুস্বাদু, সুমিষ্ট ও মানসম্মত।

বৈশাখ থেকে ভাদ্র এই কয়েক মাস গাজীপুরের বাগানগুলো পাকা কাঁঠালে ভরে ওঠে। স্থানীয় বাজারেও দেখা যায় কাঁঠালের বড় বড় স্তূপ। কিন্তু সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যায়।

জেলার কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে প্রতি বছর ৯ হাজার ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে শ্রীপুরেই উৎপাদন হয় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে।

সরেজমিনে উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়ার কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, পাকা কাঁঠালের কোষ বের করে প্রথমে ব্লেন্ডার করা হচ্ছে। এরপর কাঁঠালের রসের সঙ্গে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মণ্ড। পরে সেই মণ্ড টেবিলে নিয়ে ডাইসের সাহায্যে কেটে বিস্কুটের আকার দেওয়া হয়।

এরপর বিস্কুটগুলো ট্রেতে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। একটি ট্রেতে রাখা যায় ৩৬ পিস বিস্কুট। এমন ৩৬টি ট্রে একটি ট্রলিতে রেখে দেওয়া হয় ওভেনে। প্রায় ২৫ মিনিট পর বের করা হয় তৈরি বিস্কুট। ঠান্ডা হওয়ার পর সেগুলো বক্সজাত করে বাজারজাত করা হয়। প্রতিটি বক্সে থাকে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট।

কারখানায় উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত প্রধান কারিগর মানিক মিয়া বলেন, পাকা কাঁঠালের কোষ থেকেই মূলত বিস্কুট তৈরি করা হয়। সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোনো প্রকার কেমিক্যাল ব্যবহার না করেই বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে কাঁঠালের রস মিশিয়ে বিস্কুট তৈরি করা হচ্ছে।

সম্প্রতি নতুন ধরনের এই বিস্কুট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৈরি হয়েছে কৌতূহল। অনলাইনে অর্ডার নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে পণ্যটি।

উদ্যোক্তা আবদুস সত্তার ভূঁইয়া

স্টেড ফাস্ট কুরিয়ার কর্মী রাকিব বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলসের ‘মেহমান ফুড’ থেকে কাঁঠালের বিস্কুটের অনলাইন অর্ডার নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দিন দিন অর্ডারের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন ক্রেতার পাশাপাশি পুরোনো ক্রেতারাও আবার অর্ডার করছেন। কখনো কখনো দিনে একাধিকবার অর্ডার নিয়ে যেতে হচ্ছে।

কাঁঠালচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, শ্রীপুর তথা গাজীপুরে প্রতি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল সঠিক সংরক্ষণের অভাবে পচে-গলে নষ্ট হয়। সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় অনেক সময় বাগানের ফল বাগানেই পড়ে নষ্ট হয়। প্রক্রিয়াজাত করে এসব কাঁঠাল বাজারজাত করা গেলে তাঁর মতো অনেক চাষিই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।

চাষিদের এই প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনাও। কাঁচা বা পাকা কাঁঠাল সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করে বিস্কুট, কেক, চিপসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা গেলে মৌসুমের বাইরেও কাঁঠালের বাজার তৈরি হতে পারে।

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া বলেন, তিনি চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। সেখানে কাঁঠাল দিয়ে নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য তৈরি ও বাজারজাত হতে দেখেছেন। সেখান থেকেই কাঁঠাল দিয়ে বিস্কুট তৈরির চিন্তা আসে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কাঁঠালের চিপসসহ আরও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার নতুন এসব খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুফ করলে ভোক্তার দোরগোড়ায় আরও সুলভ মূল্যে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। দেশে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল অপচয় হয়। এ অপচয় রোধে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ ইতোমধ্যে কাঁঠালভিত্তিক ২০টিরও বেশি প্রযুক্তি ও উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এগুলো দেশব্যাপী বিভিন্ন উদ্যোক্তার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা এসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করে বাজারজাতও করছেন।

ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী আরও বলেন, সম্প্রতি শ্রীপুরের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া কাঁঠাল থেকে বিস্কুট তৈরি করেছেন, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কাঁঠালের বীজ, কাঁচা কাঁঠাল ও পাকা কাঁঠাল শুকিয়ে তৈরি করা পাউডারে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টিগুণ। বিশেষ করে প্রোটিন, মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার রয়েছে, যা শরীরের জন্য উপকারী।

তিনি জানান, নির্দিষ্ট অনুপাতে কাঁঠালের পাউডার আটা বা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে পাপড়, বিস্কুট, কেক, ক্যান্ডি ও আইসক্রিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। একইভাবে পাকা কাঁঠালের পাল্প ব্যবহার করেও বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা যায়।

MCH/YA
আরও পড়ুন