উত্তর মেরুর বরফঢাকা নর্দার্ন সি রুট বা উত্তর সমুদ্রপথ ঘিরে চীন ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার প্রচলিত বাণিজ্যপথ সংকুচিত হওয়ায় মস্কোর জন্য চীন হয়ে উঠেছে এই পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অংশীদার।
সম্প্রতি রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি এলএনজি স্থাপনা থেকে পণ্য পরিবহনে এই রুটের ব্যবহার আরও স্পষ্ট হয়েছে। মে মাসের শেষ দিকে ক্রিস্টোফ দ্য মারজেরি নামের একটি এলএনজি ট্যাংকার আর্কটিক-টু অঞ্চলের কাছে যাত্রা শুরু করে। বরফভাঙা জাহাজের সহায়তায় হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এটি রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপে পৌঁছায়। সেখানে একটি ভাসমান সংরক্ষণ ইউনিটের পাশে অবস্থান করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ এলএনজি খালাস করে বলে স্যাটেলাইট ছবি ও জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে সিএনএন।
এর পর একই এলাকায় আসে আরেকটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ট্যাংকার, আর্কটিক মুলান। জাহাজটি কয়েক দিন অবস্থানের পর একই ভাসমান সংরক্ষণ ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং প্রায় এক দিনের জন্য তার ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেয়। পরে সেটি রুশ এলএনজি নিয়ে চীনের বেইহাই বন্দরের দিকে যাত্রা করে।
জুলাইয়েও একই ধরনের পরিবহন পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ফলে নর্দার্ন সি রুট রাশিয়ার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জ্বালানি চীনে পৌঁছানোর তুলনামূলক দ্রুত বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই রুশ আর্কটিক উপকূল বরাবর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মাইল দীর্ঘ এই রুটকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৮ সালে আর্কটিকজুড়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সম্প্রসারণ হিসেবে পোলার সিল্ক রোডের ধারণা সামনে আনেন।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় চীনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো রুশ আর্কটিক অঞ্চল থেকে সরে যাওয়ার পর বেইজিং মস্কোর অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
এ মৌসুমে অন্তত ছয়টি চীনা শিপিং কোম্পানি নর্দার্ন সি রুটে ৫০টির বেশি যাত্রা পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে। এসব জাহাজের অধিকাংশই চীন ও রাশিয়ার মধ্যে চলাচল করবে।
জ্বালানি বাণিজ্যেও সম্পর্কটি দ্রুত গভীর হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সব রুট মিলিয়ে রাশিয়া থেকে চীনের এলএনজি আমদানি প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় রুশ জ্বালানির ওপর চীনের নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
তবে নর্দার্ন সি রুট এখনো সুয়েজ খালের মতো বড় বাণিজ্যপথের তুলনায় অত্যন্ত ছোট। একই সঙ্গে এর ব্যবহার মৌসুমনির্ভর এবং পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও অনেক বেশি। বরফের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে, জাহাজ আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং দুর্ঘটনা বা তেল ছড়িয়ে পড়লে আর্কটিক পরিবেশে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
তবু পশ্চিমা দেশগুলো চীন-রাশিয়ার আর্কটিক সহযোগিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস সতর্ক করেছেন, চীন আর্কটিকের বাণিজ্যপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে ভবিষ্যতে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট্টেও আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রবেশাধিকারকে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
চীন অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, আর্কটিকে তাদের কর্মকাণ্ড শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই হচ্ছে। মস্কোও মূলত চীনের জ্বালানি ক্রয় এবং নর্দার্ন সি রুটের অবকাঠামো উন্নয়নে বেইজিংয়ের সহযোগিতাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, উত্তর সমুদ্রপথ এখনো বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিকল্প প্রধান করিডোর হয়ে ওঠেনি। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলার প্রবণতা, সব মিলিয়ে এই রুট চীন-রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। আগামী এক দশকে বছরজুড়ে এই পথে নৌ চলাচল চালুর লক্ষ্যও জানিয়েছে চীনা শিপিং কোম্পানিগুলো। সূত্র: সিএনএন
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ১০ শতাংশেই রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস: জেলেনস্কি
'ট্রাম্পের শুল্ক এড়াতে চীনকে সহায়তা করেছে ৪০টির বেশি দেশ'
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি ছাড়ার নির্দেশ