ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহার করে, ব্রিটেনের এমন একটি বিমানঘাঁটি আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের কাছে পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর প্রশ্ন উঠেছে, ইউরোপের ভেতরে নজরদারি, ভয় দেখানো, নাশকতা ও সহিংসতা চালানোর সক্ষমতা ইরান কতটা তৈরি করেছে। তবে এই ঘটনায় প্রমাণের আগেই সন্দেহ কত দ্রুত ছড়ায়, সেটাও দেখা গেছে।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে ইরানের কোনো যোগসূত্র এখনো পায়নি। পাঁচজনই জামিনে মুক্ত। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং সতর্ক করে বলেছেন, তদন্ত চলার সময় সন্দেহভাজনদের উদ্দেশ্য নিয়ে জল্পনা করা ‘খুবই অবিবেচনাপ্রসূত’ হবে। ইরান অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করেছে। লন্ডনে দেশটির দূতাবাস একে ‘ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষমূলক জল্পনা’ বলে নিন্দা জানিয়েছে, যার উদ্দেশ্য ইরানবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া।
কেমন সেই কাঠামো
ইউরোপের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বহুদিন ধরে এ প্রশ্নেই মাথা ঘামাচ্ছে। সুফান সেন্টারের গবেষণা বিশ্লেষক ক্লারা ব্রোকার্ট আরব নিউজকে বলেন, ইউরোপে ইরানের কর্মপদ্ধতি এখন অনেক স্তরে বিভক্ত। এতে সংঘবদ্ধ অপরাধী থেকে শুরু করে ছোটখাটো অপরাধে জড়িত ব্যক্তি, এমনকি টাকার লোভে অনলাইনে নিয়োগ পাওয়া কিশোরেরাও আছে। ফলাফল অনেক সময় এলোমেলো বা আনাড়ি দেখালেও পেছনের ব্যবস্থা আসলে বেশ গোছানো, বলেন তিনি।
ব্রোকার্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথমে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্স বা গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থা কাজের নির্দেশ দেয়। এরপর দ্বিতীয় স্তরের হ্যান্ডলার বা অপরাধী চক্র সেই নির্দেশকে পরিকল্পনায় রূপ দেয়। শেষে ইউরোপে থাকা ‘ফুট সোলজার’রা তা বাস্তবায়ন করে। এদের অনেকের ইরান সরকারের প্রতি আদর্শিক টান প্রায় নেই বললেই চলে। তাদের বেশির ভাগকে ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়, আর হ্যান্ডলাররা তখনো মধ্যপ্রাচ্যে থাকে।
এ কারণে তাঁর মত, আপাতদৃষ্টিতে কাঁচা হাতের হামলা মানেই যে ওপর থেকে পরিকল্পিত নয়, এমন ধারণা ভুল।
মধ্যপ্রাচ্যের ছকের সঙ্গে ফারাক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যে প্রক্সি ব্যবস্থা গড়েছে, এটি তার থেকে আলাদা। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরাকের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তেহরানের সঙ্গে রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সামরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে। ইউরোপে দরকার আরও নমনীয় কিছু। লন্ডনে খুনি, স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় অগ্নিসংযোগকারী বা ইহুদি প্রতিষ্ঠানের বাইরে নজরদারিকারীকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাস করতে হয় না। টাকা নিলেই চলে।
সাম্প্রতিক এক নিউ ইয়র্কার অনুসন্ধানেও এই বিবর্তন উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে লন্ডনে নিজের বাড়ির সামনে ছুরিকাহত হন ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক পুরিয়া জেরাতি। ওই ঘটনা এবং তেহরানের বিরোধীদের ওপর হামলায় বিদেশি অপরাধীদের নিয়োগের ধরন নিয়ে প্রতিবেদনটি লেখা। সেখানে বলা হয়েছে, নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে মধ্যস্থতাকারীর পর মধ্যস্থতাকারীর একটি স্তরবিন্যাস কাজ করে।
‘অবিশ্বাস্য অস্বীকার’
ব্রোকার্টের মতে, সুইডেন ও জার্মানির মতো দেশে অপরাধী চক্রকে কাজে লাগাচ্ছে ইরান। তবে এ পদ্ধতিকে তিনি ‘বিশ্বাসযোগ্যভাবে অস্বীকারযোগ্য’ বলতে রাজি নন, বরং বলেন ‘অবিশ্বাস্যভাবে অস্বীকারযোগ্য’। পশ্চিমা সরকারগুলো তাদের কথা বিশ্বাস করবে, তেহরান এটা হয়তো আশাই করে না। মধ্যস্থতাকারী অপরাধীদের স্তর আসলে এমন সরাসরি ও অকাট্য দায় নির্ধারণ ঠেকায়, যা কড়া জবাব দিতে বাধ্য করতে পারে।
তুলনায় ২০১৮ সালে প্যারিসের বাইরে ইরানের প্রতিরোধ জাতীয় পরিষদের সমাবেশে বোমা হামলার ষড়যন্ত্র ছিল সরাসরি। ভিয়েনায় নিয়োজিত ইরানি কূটনীতিক আসাদুল্লাহ আসাদি এতে জড়িত ছিলেন এবং পরে বেলজিয়ামে দণ্ডিত হন। ব্রোকার্ট মনে করেন না যে ইরান আবার সেই পথে হাঁটবে। তাঁর ভাষ্য, এখনকার কৌশল পুরোপুরি ‘অবিশ্বাস্য অস্বীকারের’ ওপর দাঁড়িয়ে। এসব অভিযান যে ইরানের সঙ্গে যুক্ত, তা আমরা জানি। সংকটে থাকা শাসকগোষ্ঠীও তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বাড়ানোর সীমার নিচে থেকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে, এই বার্তা দেওয়াই লক্ষ্য।
যেসব দেশে অভিযোগ
সুইডেনের কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি ও ইহুদি লক্ষ্যবস্তুসহ বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতায় ইরান অপরাধী চক্র ব্যবহার করছে। দেশটির কুখ্যাত অপরাধী সংগঠন ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের ওপর তেহরানের হয়ে হামলার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। ডাচ গোয়েন্দা সংস্থাও অভিযোগ করেছে, শাসকগোষ্ঠীর বিরোধীদের হত্যার ষড়যন্ত্রে ইউরোপের অপরাধী চক্রকে ব্যবহার করেছে ইরান। ব্রিটেন এখন সর্বশেষ এমন সমস্যার মুখে পড়া দেশ বলে মনে হচ্ছে।
ফার্সি ভাষার সম্প্রচারমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও তার সাংবাদিকেরা বারবার ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য হয়েছেন। ইরানি রাষ্ট্রীয় হুমকি ঠেকাতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা ও আইন কঠোর করেছে। আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন কৌঁসুলিরা ইরানি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন যে তাঁরা ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যায় সংঘবদ্ধ অপরাধীদের ভাড়া করার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে ইরানি-আমেরিকান সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদও রয়েছেন।
লন্ডনে এ বছরের ২৩ মার্চ ইহুদি সম্প্রদায়ের সংগঠন হাটজোলার চারটি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ একে ইহুদিবিদ্বেষী ঘৃণাজনিত অপরাধ হিসেবে দেখছে। এ ঘটনায় চারজন ২৮ আগস্ট দোষ স্বীকার করেছেন।
ঠেকানো কেন কঠিন
ব্রোকার্ট বলেন, এই হুমকি ঠেকানো কঠিন, কারণ অনেক রিক্রুট প্রচলিত গোয়েন্দা ছকে পড়েই না। যাদের কোনো স্পষ্ট আদর্শিক টান নেই, সেই কিশোরদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারির কোনো কারণই তৈরি হয় না। ইরান অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও সুযোগসন্ধানী তরুণ রিক্রুটদের মধ্যকার ফাঁকফোকর কাজে লাগাতে শিখেছে, যোগ করেন তিনি।
টাকা সরাসরি ইরানি গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট কোনো হিসাব থেকে কিশোর রিক্রুটের কাছে যায় না। মধ্যস্থতাকারীর স্তর ও ঘোলাটে অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি হামলাকারী ও আসল পৃষ্ঠপোষকের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। ব্রোকার্টের মতে, এটি ক্রমেই রাশিয়ার ইউরোপবিরোধী হাইব্রিড যুদ্ধের কৌশলের মতো হয়ে উঠছে। ‘ইরান স্পষ্টতই রাশিয়ার হাইব্রিড কৌশল থেকে শিখছে,’ বলেন তিনি।
ব্যর্থ অভিযানও কাজে লাগে
ছোট বা ব্যর্থ অভিযানেরও কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে, মনে করেন এই বিশ্লেষক। এতে যে প্রচার হয়, তা দেখায় যে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে প্রতিপক্ষের নাগাল পায়। লন্ডন, স্টকহোম বা বার্লিনে বিরোধীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব, এই ধারণাই সরকার, সাংবাদিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তায় বাড়তি খরচ করতে এবং স্থায়ী অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচতে বাধ্য করে।
ব্রোকার্টের মতে, ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ চাপে পড়ায় তেহরান কেবল ইউরোপে বেশি অভিযানের দিকে ঝুঁকেছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং মিত্র কিছু সংগঠনও একই পদ্ধতি নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি হারাকাত আসহাবুল ইয়ামিন আল-ইসলামিয়ার (হায়ি) নাম করেন। এই গোষ্ঠী ইউরোপে অভিযানের দায় স্বীকার করেছে এবং মার্কিন কৌঁসুলিরা ইরাকের কাতাইব হিজবুল্লাহর সঙ্গে এর যোগ দেখিয়েছেন। মহাদেশজুড়ে হামাসের কথিত ষড়যন্ত্রের কথাও বলেন তিনি।
‘এর মানে এই নয় যে তেহরান সব সময় এসবের অনুমোদন দিয়েছে,’ সতর্ক করেন ব্রোকার্ট। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরের সমাজগুলোতে ‘যুদ্ধ নিয়ে আসার’ সংকেত দিতে মিত্র সংগঠনগুলো যে পথ খুঁজছে, তা এতে স্পষ্ট হয়। তাঁর তুলনায়, হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টির যুক্তিও অনেকটা এমন: এমন পরিণতি তৈরি করা, যা শেষ পর্যন্ত বিদেশের সাধারণ মানুষও নিজেরা টের পান।
ধাঁধায় পশ্চিমা সরকার
ইরানের প্রচলিত ও আঞ্চলিক সামরিক বিকল্প চাপে পড়ায় এই কৌশল এখন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এ বছরের শুরুতে দ্য আটলান্টিকে সন্ত্রাসবিষয়ক বিশ্লেষক কলিন পি. ক্লার্ক লিখেছিলেন, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্রশক্তি বা প্রচলিত প্রক্সি দুর্বল করলেই প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না। বরং কম খরচের এবং কম শনাক্তযোগ্য বিদেশি অভিযান আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমা সরকারগুলোর জন্য এটি এক ধাঁধা: প্রচলিত জবাব দেওয়ার ইরানি সক্ষমতা দুর্বল করলে ছায়াযুদ্ধের দিকে ঝোঁকার প্রণোদনা একই সঙ্গে বাড়তে পারে।
দায় নির্ধারণে সতর্কতা
ব্রোকার্ট মনে করিয়ে দেন, দায় চাপানোর ক্ষেত্রেও সাবধান হওয়া জরুরি। প্রতিটি সন্দেহজনক ঘটনাকে সঙ্গে সঙ্গে ইরানের বৈশ্বিক নাগালের প্রমাণ হিসেবে ধরা হলে তাতে ইরানেরই লাভ। তাই দায় নির্ধারণ হতে হবে নির্ভুল ও মাপা। তিনি বলেন, ‘যখন পরিস্থিতি অস্পষ্ট থাকে, আর এই ছায়াযুদ্ধে সব সময়ই তা থাকে, কারণ প্রতিটি অভিযানের অনেক স্তর সরাতে হয়, তখন তিনটি অবস্থার মধ্যে ফারাক করা ন্যায্য। ইরানের দায় কখন “তদন্তের একটি দিক”, কখন “ইরানি কৌশলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ”, আর কখন স্পষ্টভাবে ইসলামি শাসকগোষ্ঠীর ওপর বর্তায়।’
ফেয়ারফোর্ডের ঘটনায় এই কাঠামো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ঘাঁটিটিতে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেওয়া মার্কিন বিমান থাকে, তাই গ্রেপ্তারগুলো স্বভাবতই স্পর্শকাতর। তবে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে তেহরান নির্দেশ দিয়েছিল, এমন কোনো প্রমাণ এখন নেই। ইরানও স্পষ্টভাবে যোগ অস্বীকার করেছে।
ইউরোপে ইরান-সংশ্লিষ্ট আগের অভিযানগুলোর লক্ষ্য মূলত ছিলেন ভিন্নমতাবলম্বী, প্রবাসী সাংবাদিক, ইহুদি ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু এবং তেহরানের চোখে অন্য বিরোধীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনায় হামলা হলে তা হবে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা অবকাঠামোয় সরাসরি নাশকতার দিকে বড় ধরনের ধাপ।
তবু ইরানের নাম এত দ্রুত আলোচনায় ওঠা থেকে বোঝা যায়, পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখন এই হুমকিকে কীভাবে দেখে। উদ্বেগ আর শুধু এটা নয় যে আইআরজিসির কর্মকর্তা বা ইরানি গোয়েন্দা এজেন্টরা ইউরোপে ঢুকে হামলা সংগঠিত করতে পারে। উদ্বেগ হলো, তেহরানের হয়তো তাঁদের দরকারই নেই।
সূত্র: আরব নিউজ
যুদ্ধজাহাজ দূরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ওয়াশিংটন
বন্ধ মসজিদে শত শত ইসরায়েলি নিয়ে ঢুকলেন বেন-গভির
ছয় মাসেই ইরান-আজারবাইজানের বাণিজ্য বেড়েছে
তিন পাইলটের খোঁজে কাতারের কাছে আবাও তথ্য চেয়েছে ইরান
যুদ্ধ চাইছে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান নয়: আব্বাস আরাগচি
‘যুক্তরাষ্ট্রের সামনে পরাজয় স্বীকার করে অঞ্চল ছাড়ার বিকল্প নেই’
ইরানের খোলা বাজারে ডলারের দাম ছাড়াল ২৫ লাখ রিয়াল
'ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোও নিরাপদ নয়'