কথা ছিলো ২১ দিনের কোয়ারেন্টিন, এক দশকেও মেলেনি মুক্তি

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

দেড় মাস বয়সে পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়ার পর তাদের রাখা হয়েছিল মাত্র তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে। উদ্দেশ্য ছিল স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই অস্থায়ী ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি বন্দিশালা। প্রায় এক দশক ধরে ছোট দুটি কক্ষেই কাটছে দুই লেপার্ডের জীবন।

ঘটনাটি গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গাজীপুর সাফারি পার্কের। বর্তমানে পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠা লেপার্ড দুটির জন্য এখনো তৈরি হয়নি এমন কোনো উপযুক্ত এনক্লোজার, যেখানে তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা, গাছে ওঠা বা লাফানোর সুযোগ পেতে পারে। বন্যপ্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিন শেডের পাশাপাশি দুটি ছোট কক্ষই তাদের স্থায়ী আবাসে পরিণত হয়েছে।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে যশোর থেকে লেপার্ডের দুটি শাবক উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শাবক দুটিকে গ্রহণ করে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠান। সেখানে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার নিয়ম অনুযায়ী তাদের তিন সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য তাদের রাখা হয় পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে।

কিন্তু নির্ধারিত সেই তিন সপ্তাহ শেষ হওয়ার পরও তাদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা হয়নি। একে একে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১০ বছর। এর মধ্যে ছোট শাবক দুটি পূর্ণবয়স্ক লেপার্ডে পরিণত হলেও বদলায়নি তাদের থাকার জায়গা।

সম্প্রতি সাফারি পার্কের কোয়ারেন্টিন শেডে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা দুটি ছোট কক্ষে রাখা হয়েছে লেপার্ড দুটিকে। স্বাভাবিকভাবে বনে বিচরণ করা এই প্রাণীর জন্য যে পরিমাণ জায়গা প্রয়োজন, সেখানে তার সামান্য অংশও নেই। নেই পর্যাপ্ত দৌড়ানোর জায়গা, গাছে ওঠার সুযোগ কিংবা প্রাকৃতিক আচরণ প্রকাশের মতো পরিবেশ।

দর্শনার্থী কিংবা মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই প্রাণী দুটিকে অস্থির হয়ে উঠতে দেখা যায়। কখনো লোহার গ্রিলের দিকে ছুটে যাচ্ছে, কখনো গ্রিলে আঘাত করছে। দীর্ঘদিনের সীমিত পরিবেশ তাদের আচরণে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, এমন দৃশ্য সেই প্রশ্নই সামনে আনছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান বলেন, জীবাণুমুক্ত পরিবেশে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ কোয়ারেন্টিন যথেষ্ট। তাঁর মতে, সাফারি পার্কের মূল ধারণাই হলো প্রাণীদের তুলনামূলক উন্মুক্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে রাখা। সে জায়গায় বছরের পর বছর একটি ছোট ঘরে লেপার্ড আটকে রাখা সেই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, বাঘ ও সিংহের মতো লেপার্ডের জন্যও দ্রুত উপযুক্ত এনক্লোজার নির্মাণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রাণী দুটি স্বাভাবিক আচরণ করার সুযোগ পায়।

সাফারি পার্কে আসা দর্শনার্থীরাও লেপার্ড দুটির এমন অবস্থায় বিস্ময় প্রকাশ করছেন। তাদের অনেকের মতে, দেশের সাধারণ চিড়িয়াখানাগুলোতে সচরাচর লেপার্ড দেখার সুযোগ পাওয়া যায় না। অথচ সাফারি পার্কে দুটি লেপার্ড থাকার পরও সেগুলো দর্শনার্থীদের কাছ থেকে আড়ালেই ছোট কক্ষে বন্দি অবস্থায় রয়েছে।

দর্শনার্থীদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রয়োজন হলে আলাদা টিকিটের ব্যবস্থা করে হলেও প্রাণী দুটির জন্য উপযুক্ত আবাস তৈরি করা যেতে পারে। এতে একদিকে লেপার্ড দুটির স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে দর্শনার্থীরাও বিরল এই প্রাণী দেখার সুযোগ পাবেন।

তবে লেপার্ড দুটির জন্য আলাদা আবাসন নির্মাণের দাবি নতুন নয়। ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গাজীপুর সাফারি পার্ক পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি লেপার্ড দুটির জন্য আবাসন তৈরির নির্দেশনা দেন।

এর আগেও বিভিন্ন সময়ে উচ্চপর্যায় থেকে প্রাণী দুটির আবাসন নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব নির্দেশনার পরও এখন পর্যন্ত তাদের জন্য উপযুক্ত এনক্লোজার নির্মাণে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি লেপার্ড দুটির অবস্থান পরিদর্শন করেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তিন সপ্তাহের জন্য তৈরি কোয়ারেন্টিন কক্ষেই প্রায় এক দশক কাটিয়ে দেওয়া দুই লেপার্ডের গল্প তাই শুধু দুটি বন্যপ্রাণীর আবাসন সংকটের বিষয় নয়; এটি দেশের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতিরও একটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

এম.সি.এইচ
আরও পড়ুন