চুয়াডাঙ্গায় ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

চুয়াডাঙ্গার বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান উপশম নার্সিং হোমে অস্ত্রোপচারের সময় রবগুল মোল্লা (৪৮) নামে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। মৃত্যুর পর চিকিৎসক ও নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের আচরণে ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজন প্রতিষ্ঠানটিতে দুই দফা ভাঙচুর চালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ও উপশম নার্সিং হোমের মালিক ডা. এহসানুল হক তন্ময়ের প্রতিষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত রবগুল মোল্লা চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সুবদিয়া গ্রামের খেজমত মোল্লার ছেলে।

রোগীর স্বজনদের ভাষ্য, পিত্তথলিতে পাথর ও টিউমার ধরা পড়ায় শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রবগুল মোল্লাকে উপশম নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। পরদিন শনিবার বেলা ৩টার দিকে তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার চলাকালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে তিনি মারা যান বলে স্বজনদের দাবি।

স্বজনদের অভিযোগ, ডা. এহসানুল হক তন্ময়, একজন অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসক এবং অপারেশন থিয়েটারের টেকনিশিয়ানসহ সংশ্লিষ্টদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে অস্ত্রোপচারের সময় রবগুল মোল্লার অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তার মৃত্যু হয়। তবে চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

রোগীর বোন সখেনা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় তার ভাইয়ের অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসককে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। পরে চিকিৎসক অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে যান। এরপর তারা জানতে পারেন, রবগুল মোল্লা মারা গেছেন।

রোগীর ভাতিজি চুমকি খাতুন বলেন, তার চাচার মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এদিকে রোগীর মৃত্যুর খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গেও কর্তৃপক্ষের কয়েকজনের রূঢ় আচরণের অভিযোগ করেন স্বজনরা। এ ঘটনায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।

পরবর্তীতে রোগীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলে সন্ধ্যার পর নার্সিং হোমের সামনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে দুই দফায় উত্তেজিত স্বজন ও স্থানীয় লোকজন নার্সিং হোমে ভাঙচুর চালান। এ সময় প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র ও কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাত ৮টার দিকে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও চিকিৎসকদের একটি প্রতিনিধি দল বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফ। তিনি ক্ষুব্ধ স্বজন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

শরীফুজ্জামান শরীফ জানান, পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের জন্য অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার পর রবগুল মোল্লার আর জ্ঞান ফেরেনি। পরে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর বিভিন্ন লোকজনের জড়ো হওয়া ও উত্তেজনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে যান চলাচলও ব্যাহত হয়।

তিনি বলেন, নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দাফন শেষে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

শরীফুজ্জামান শরীফ আরও জানান, বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উপশম নার্সিং হোম বন্ধ থাকবে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ডোপ টেস্ট করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি সিভিল সার্জনের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটি অপারেশন থিয়েটারের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করবে এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় বিষয়টির সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রোগীর মৃত্যুর কারণ বা চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমইউ
আরও পড়ুন