ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে চাপে পেজেশকিয়ান

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৬ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিউইয়র্কে সম্ভাব্য বৈঠককে কেন্দ্র করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে থাকা পেজেশকিয়ানকে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানাচ্ছেন সংস্কারপন্থী ও মধ্যপন্থী মহলের কেউ কেউ। অন্যদিকে রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী রাজনীতিকেরা সরাসরি আলোচনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একদিকে যুদ্ধ ও কঠোর হুমকি অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও শুরু হয়েছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে বিভক্তি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন, নিউইয়র্কে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বসতে তিনি আগ্রহী। তবে ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি এমন বৈঠকের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই মঙ্গলবার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। ট্রাম্প পরে ওই বৈঠককে ‘খুব ভালো’ বলে মন্তব্য করেন এবং দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান।

তবে ইরানের অভ্যন্তরে প্রেসিডেন্টের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রক্ষণশীল মহলের আশঙ্কা, ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বৈঠককে ওয়াশিংটন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে এবং সেটিকে ইরানের দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।

ইরানি আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ রোস্তামি সরাসরি পেজেশকিয়ান–ট্রাম্প বৈঠকের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয়।

কট্টরপন্থীদের আপত্তি

পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্ক সফর নিয়েও ইরানের রক্ষণশীল মহলে সমালোচনা রয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের প্রশ্ন—যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান সরাসরি যুদ্ধে রয়েছে, সেই দেশের ভূখণ্ডে গিয়ে প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা উপযোগী?

ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম ফার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, সেখানে এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে যে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পরই জাতিসংঘের অধিবেশনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ এবং সামুদ্রিক অবরোধের বিষয়ও সমালোচনার যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।

সাবেক ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি কমান্ডার হোসেইন কানানি-মোগাদ্দামও পেজেশকিয়ানের সফর নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ইরানের বক্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ হতে পারে।

অন্যদিকে আলোচনার পক্ষে যুক্তি

তবে ইরানের রাজনৈতিক পরিসরে সবাই পেজেশকিয়ানের সফর বা সম্ভাব্য বৈঠকের বিরোধিতা করছেন না। মধ্যপন্থী সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলের যুক্তি, যুদ্ধের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।

ইরানের মধ্যপন্থী দৈনিক ‘এতেমাদ’ অতীতের উদাহরণ টেনে দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির মধ্যে ২০০০ সালে এবং বারাক ওবামা ও হাসান রুহানির মধ্যে ২০১৩ সালে সম্ভাব্য যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তাদের যুক্তি, নিউইয়র্কের মতো বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক পরিবেশ সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কিছু সংবাদমাধ্যম জাতিসংঘকে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এ সফরের মাধ্যমে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য যোগাযোগের পথ খোলা রাখা সম্ভব।

পেজেশকিয়ানের অবস্থান কী?

নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, তিনি জাতিসংঘে ইরানের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের অভিযোগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবার শক্তি প্রয়োগ করা হলে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

অর্থাৎ পেজেশকিয়ানের অবস্থানকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমঝোতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বরং তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে প্রতিরোধ ও কূটনীতির দুটি দিকই রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও নিউইয়র্কে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগানোর কথা বলেছেন। জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে উইটকফ ও কুশনারের বৈঠক সেই যোগাযোগেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

যুদ্ধের মধ্যে কূটনীতির কঠিন সমীকরণ

পেজেশকিয়ানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ যতটা কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, ততটাই তা দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

একদিকে ইরানের অর্থনীতি যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সংকটে চাপে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বৈঠককে ইরানের কট্টরপন্থী মহল ছাড় দেওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। ফলে প্রেসিডেন্টকে একই সঙ্গে দেশের ভেতরে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ানের জন্য প্রকাশ্য ট্রাম্প–পেজেশকিয়ান বৈঠকের চেয়ে মধ্যস্থতাকারী বা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—এমন বিশ্লেষণও উঠে এসেছে।

সামনে কী?

নিউইয়র্কে পেজেশকিয়ানের সফর তাই শুধু জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা নয়; এটি ইরানের পররাষ্ট্রনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ওয়াশিংটন একদিকে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলছে, অন্যদিকে সামরিক চাপ ও কঠোর হুমকিও অব্যাহত রেখেছে। তেহরানও একদিকে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছে না, অন্যদিকে সরাসরি আলোচনার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ আপত্তি স্পষ্ট।

ফলে ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৈঠক হয় কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত কমানোর মতো রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারে কি না।

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, নিউইয়র্কে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। কিন্তু সেই যোগাযোগ পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতির দিকে এগোবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত