কার ‘ভয়ে’ তাড়াহুড়া করে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লেন নেতানিয়াহু, যা জানা যাচ্ছে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে ইসরায়েলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নিউইয়র্কে তাঁর এবারের সফর ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত—প্রায় এক দিনের বদলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন তিনি।

নেতানিয়াহুর এই দ্রুত প্রত্যাবর্তন ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—কিসের আশঙ্কায় এত তাড়াহুড়া করে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লেন তিনি?

প্রকাশিত ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর পেছনে ছিল নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সতর্কতা। তবে সতর্কতার সুনির্দিষ্ট ধরন বা সম্ভাব্য হুমকির উৎস প্রকাশ করা হয়নি। ইসরায়েলি চ্যানেল ১৩-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি বৈঠকে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রে রাতযাপন না করার পরামর্শ দেন। বৈঠকগুলোতে যে ‘গোয়েন্দা চিত্র’ উপস্থাপন করা হয়েছিল, তাতে নির্দিষ্ট কিছু সতর্কতার কথা ছিল বলে জানানো হলেও সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

কয়েক ঘণ্টার সফর, রাত কাটালেন না নিউইয়র্কে

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল অস্বাভাবিকভাবে সংক্ষিপ্ত। দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে তিনি আট ঘণ্টারও কম সময় থাকার কথা ছিল। গত বছর জাতিসংঘ অধিবেশনে তাঁর সফর ছিল প্রায় এক সপ্তাহের এবং সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠকও হয়েছিল। এবার সেই ধরনের দীর্ঘ কর্মসূচি ছিল না।

নিরাপত্তা সতর্কতার খবর প্রকাশের পর তাঁর সফরসূচি আরও সংকুচিত করা হয়। এর আগে টেক্সাসে উদ্যোক্তা ও টেসলা প্রধান ইলন মাস্কের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের কর্মসূচিও বাতিল করা হয়েছিল। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর সফরের প্রস্তুতিতে একটি অগ্রবর্তী দল টেক্সাসে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সেই কর্মসূচি বাদ পড়ে।

তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় সফর সংক্ষিপ্ত করার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করেনি। তাই ‘কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভয়ে’ তিনি নিউইয়র্ক ছেড়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো নেই।

নিউইয়র্কে ছিল বিক্ষোভের চাপও

নেতানিয়াহুর সফরের সময় নিউইয়র্কে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। গাজা যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সামরিক নীতির প্রতিবাদে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের আশপাশে বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। নেতানিয়াহুর সফরকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছিল।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গেও নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছিল। মামদানি এর আগে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের কথা বলেছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষের এককভাবে এমন গ্রেপ্তার করার আইনগত ক্ষমতা নেই। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সম্মানের আহ্বান জানান।

তবে এসব রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিক্ষোভকে নেতানিয়াহুর দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সরাসরি কারণ হিসেবে ইসরায়েল সরকার নিশ্চিত করেনি। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সতর্কতার বিষয়টিই প্রকাশিত প্রতিবেদনে মূল কারণ হিসেবে এসেছে।

কারা দিয়েছিল সতর্কতা?

এখানেই রহস্যের বড় অংশ। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুকে নিউইয়র্কে রাত না কাটানোর সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু সম্ভাব্য হামলা, হত্যাচেষ্টা, অপহরণ, বিক্ষোভ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট হুমকির কথা তাঁরা প্রকাশ্যে জানাননি। ফলে সতর্কতার প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

অর্থাৎ, প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়—নেতানিয়াহু কোনো একজন ব্যক্তির ‘ভয়ে’ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন—এমন প্রমাণ নেই; বরং ইসরায়েলি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সফর সংক্ষিপ্ত করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে।

জাতিসংঘে ভাষণ, এরপর লাতিন আমেরিকার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক

নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেও নিউইয়র্কে পৌঁছে জাতিসংঘে ভাষণ দেন নেতানিয়াহু। এরপর তিনি লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন।

প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা, পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো এবং বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ পেরেইরার সঙ্গে বৈঠকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার আহ্বান জানান তিনি। বৈঠকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় আসে।

নেতানিয়াহু লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে তথাকথিত ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’-এর আওতায় আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের লক্ষ্য লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা।

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকও হয়নি

এবারের সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর কোনো নির্ধারিত বৈঠক না থাকা। মার্কিন কর্মকর্তারা এর জন্য সময়সূচির জটিলতার কথা জানিয়েছিলেন। রয়টার্সও নেতানিয়াহুর সংক্ষিপ্ত সফরকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ফলে নিরাপত্তা সতর্কতার পাশাপাশি তাঁর এবারের সফরকে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আগের বছরের তুলনায় ভিন্ন এক পরিস্থিতির মধ্যকার সফর হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তাহলে আসল আশঙ্কা কী?

এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় না থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই সতর্কতার সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা হয়নি।

নিউইয়র্কে তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গাজা যুদ্ধ নিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনা, ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ঘিরে বিরোধ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক উত্তেজনা—সবই তাঁর সফরকে স্পর্শকাতর করে তুলেছিল। তবে এসবের কোনটি নিরাপত্তা সতর্কতার মূল কারণ ছিল, তা নিশ্চিত করার মতো সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

তাই আপাতত সবচেয়ে তথ্যনির্ভর ব্যাখ্যা হলো—নেতানিয়াহুর দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের ‘ভয়ে’ হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই; ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দেওয়া অপ্রকাশিত গোয়েন্দা সতর্কতার ভিত্তিতেই তাঁর সফর রাতযাপন ছাড়া কয়েক ঘণ্টায় সীমিত করা হয়েছিল।

এ ঘটনার আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ: নিরাপত্তা সতর্কতার বিস্তারিত প্রকাশ না করায় ভবিষ্যতে নতুন তথ্য না আসা পর্যন্ত সম্ভাব্য হুমকির উৎস নিয়ে যে কোনো নির্দিষ্ট দাবি অনুমাননির্ভর হয়ে থাকবে।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত