কুলিক নদীর তীরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো রাজবাড়ি। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও জন্মেছে বুনো গাছপালা, কোথাও ভেঙে গেছে ইট-সুরকি। একসময় যে প্রাসাদে ছিল জাঁকজমক, অতিথি আপ্যায়নে ছিল রাজকীয় আয়োজন, আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা ও অবহেলার ছাপ।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার এই রাজবাড়িই রাজা টঙ্কনাথের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে এখানে টাকার নোট পর্যন্ত পোড়ানো হয়েছিল। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐশ্বর্যের স্মৃতিচিহ্ন এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
ঠাকুরগাঁও শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে কুলিক নদীর তীরে রাণীশংকৈল। ইতিহাস, লোককথা ও জমিদারি ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই জনপদের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে রাজা টঙ্কনাথ চৌধুরীর নাম।
রাজা টঙ্কনাথের উত্থানের গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা বুদ্ধিনাথ ছিলেন একজন মৈথিলি ব্রাহ্মণ। রাণীশংকৈল সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পূর্বে কাতিহার এলাকায় এক গোয়ালা বংশীয় জমিদারের মন্দিরে তিনি সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

সেই জমিদার ছিলেন নিঃসন্তান। কথিত আছে, তিনি কাশী যাওয়ার সময় একটি তাম্রপাতে দলিল করে যান। সেখানে বলা হয়েছিল, তিনি যদি আর ফিরে না আসেন, তাহলে তাঁর জমিদারির মালিকানা পাবেন সেবায়েত বুদ্ধিনাথ।
জমিদার আর ফিরে আসেননি। আর সেই ঘটনাই বুদ্ধিনাথের জীবনে নিয়ে আসে বড় পরিবর্তন।
তবে এই ইতিহাসের আরেকটি মতও প্রচলিত রয়েছে। সেই মত অনুযায়ী, আঠারো শতকের শেষ দিকে এ এলাকার নাম ছিল রামগঞ্জ। জমিদারি ছিল নাথপন্থী দুই সহোদর নারীর হাতে। স্থানীয়ভাবে তাঁরা ‘বড় রাণী’ ও ‘ছোট রাণী’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁরাও কাশী যাওয়ার সময় সেবায়েত বুদ্ধিনাথের নামে জমিদারি লিখে দিয়ে যান বলে জনশ্রুতি রয়েছে। শর্ত ছিল, তাঁরা ফিরে না এলে জমিদারির মালিক হবেন বুদ্ধিনাথ।

তাঁরা আর ফিরে আসেননি। এভাবেই একজন সাধারণ সেবায়েতের পরিবার জমিদারির মালিক হয়ে ওঠে।
জমিদারি পাওয়ার পর বুদ্ধিনাথ রাজবাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেন বলে প্রচলিত আছে। তবে সেই নির্মাণকাজ শেষ করেন তাঁর ছেলে টঙ্কনাথ।
বুদ্ধিনাথের তিন ছেলে রামনাথ, টঙ্কনাথ ও গৌরাঙ্গনাথ। বড় ছেলে রামনাথের অকালমৃত্যু হয়। ছোট ছেলে গৌরাঙ্গনাথ ছিলেন সরল প্রকৃতির। অন্যদিকে টঙ্কনাথ ছিলেন বুদ্ধিমান ও কৌশলী।
বাবার মৃত্যুর পর জমিদারির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন টঙ্কনাথ। পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং ‘মালদুয়ার স্টেট’ প্রতিষ্ঠা করেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
জমিদারি হয়তো বাংলার সবচেয়ে বড় জমিদারিগুলোর একটি ছিল না, কিন্তু টঙ্কনাথের জীবনযাপন ও প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ছিল আভিজাত্যের ছাপ।
রাণীশংকৈল নামটির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে রাজপরিবারের গল্প।

টঙ্কনাথ চৌধুরীর স্ত্রীর নাম ছিল জয়রামা শঙ্করী দেবী। লোকমুখে তিনি ‘রানীশঙ্করী দেবী’ নামে পরিচিত ছিলেন। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে তাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখে মালদুয়ার স্টেটের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রাণীশংকৈল’।
নামটির উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা ব্যাখ্যা থাকলেও রাজা টঙ্কনাথের পরিবারের সঙ্গে রাণীশংকৈলের নামের সম্পর্কের বিষয়টি এ অঞ্চলের ইতিহাস ও লোককথায় বিশেষভাবে আলোচিত।
রাজা টঙ্কনাথের বিত্তবৈভবের নানা গল্প আজও স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত গল্পটি হলো অতিথি আপ্যায়নের। কথিত আছে, একবার তাঁর আমন্ত্রণে তৎকালীন ব্রিটিশ বড়লাট এবং দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজানাথ রায় রাণীশংকৈলে এসেছিলেন। অতিথিদের সামনে নিজের সামর্থ্য ও আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য টঙ্কনাথ নাকি টাকার নোট পুড়িয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
শুধু তা-ই নয়, অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যবহার করা হয়েছিল বিপুল স্বর্ণালংকার এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে।
এই রাজকীয় আতিথেয়তার পর ১৯২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজানাথ রায় তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেন বলে প্রচলিত রয়েছে। এরপর থেকেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘রাজা টঙ্কনাথ’ নামে।
তবে টাকার নোট পোড়ানো বা উপাধি প্রদানের ঘটনাগুলোর সব বিবরণ সমানভাবে নথিভুক্ত নয়; এগুলোর কিছু অংশ স্থানীয় জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও ভারত বিভক্তির পর জমিদারি ব্যবস্থার ওপরও নেমে আসে বড় পরিবর্তন। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের ১৭ আগস্ট রাজা টঙ্কনাথ সপরিবারে রাণীশংকৈল ছেড়ে ভারতে চলে যান।
একসময় যেখানে রাজকীয় আয়োজন, অতিথি সমাগম ও প্রভাব-প্রতিপত্তির গল্প ছিল, সেই রাজবাড়ি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের অযত্নে ভবনের বিভিন্ন অংশ জীর্ণ হয়ে গেছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ছাদ ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশে জন্মেছে গাছপালা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে রাজবাড়ির মূল্যবান কাঠ, ইট, লোহা ও অন্যান্য সামগ্রীও চুরি হয়ে গেছে। চারপাশে গড়ে উঠেছে ছিন্নমূল মানুষের বসতি।
ফলে স্থাপনাটি এখন শুধু একটি পুরোনো ভবন নয় বরং দ্রুত হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন।
রাজবাড়িটির বর্তমান অবস্থা যতই জরাজীর্ণ হোক, এর প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমী মানুষ এখানে আসেন।

কেউ দেখতে চান জমিদারি আমলের স্থাপত্য, কেউ জানতে চান রাজা টঙ্কনাথের উত্থান-পতনের গল্প। আবার অনেকের কাছে এই রাজবাড়ি উত্তরবঙ্গের জমিদারি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
একসময় যার দেয়ালের ভেতরে ছিল ক্ষমতা, অর্থ ও আভিজাত্যের গল্প, আজ সেই দেয়ালই সময়ের নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করছে।
রাজা টঙ্কনাথের জীবনও যেন সেই পরিবর্তনের প্রতীক। একজন সেবায়েত পরিবারের সন্তান থেকে জমিদারি ও রাজকীয় মর্যাদায় উত্থান, ব্রিটিশ আমলে প্রভাব-প্রতিপত্তি, এরপর দেশভাগের অভিঘাতে সবকিছু ফেলে চলে যাওয়া একটি মানুষের জীবনের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে উপমহাদেশের ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
কুলিক নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ রাজবাড়িটি তাই শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়। এর প্রতিটি ইট, প্রতিটি ভাঙা দেয়াল আর নিঃসঙ্গ প্রাঙ্গণ মনে করিয়ে দেয় ক্ষমতা ও বিত্তের জৌলুশ চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি থেকে যায়।
আজ প্রয়োজন সেই স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা। নইলে অবহেলা ও সময়ের ক্ষয়ে একদিন হয়তো রাজা টঙ্কনাথের রাজবাড়ির গল্পও শুধু লোককথায় টিকে থাকবে।
ধর্ষণের পর ৬ বছরের শিশু মৃত্যুর অভিযোগ, কিশোর আটক
বঙ্গোপসাগরে ভাসতে থাকা ৮ জেলে উদ্ধার
মেঘনায় ট্রলারডুবি: ২৩ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি ৪ জনের
২৪ কোটি টাকার সেতু নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ
সিংড়ায় ঈদগাহের জমি নিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত ৩০
সংকট সমাধানে একাধিক প্রস্তাব দিলেও গুরুত্ব দেয়নি সরকার: গোলাম পরওয়ার