ইরানে নারীদের কী ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যুদ্ধের মাঠে কী করবে তারা?

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৬ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আবহ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে ইরানে নারীদের সামরিক ও জরুরি প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ছে। দেশটিতে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের অস্ত্র ব্যবহার, আত্মরক্ষা, জরুরি চিকিৎসা ও দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ইরানের সামরিক-সেবা আইনে বাধ্যতামূলক সেনাসেবা মূলত পুরুষ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। তবে একই আইনের একটি বিধানে নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির দায়িত্ব বসিজ বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। ফলে নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা বাধ্যতামূলক নয়।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও এবং ইরানি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটির নারীরা এখন আগের তুলনায় আরও সক্রিয়ভাবে সামরিক প্রস্তুতি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। বিশেষ করে বসিজের ‘জনফাদা’ বা ‘জান ফদা’ উদ্যোগের আওতায় নারীদের মৌলিক অস্ত্র পরিচালনা, আত্মরক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ইমাম হোসেন স্কয়ারে অস্ত্র প্রশিক্ষণ

তেহরানের ইমাম হোসেন স্কয়ারে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত একটি নারী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এ পরিবর্তনের অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ। প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে চাদর পরা নারীদের হাতে ছোট অস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে দেখা গেছে। কোথাও তাদের অস্ত্র ধারণ, অবস্থান নেওয়া ও আত্মরক্ষার কৌশল অনুশীলন করতে দেখা যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ‘জনফাদা’ উদ্যোগের আওতায় নারীদের জন্য পরিচালিত প্রথমদিকের দৃশ্যমান অস্ত্র প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোর একটি। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হিসেবে জরুরি পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

তবে এসব প্রশিক্ষণকে নিয়মিত সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ ইউনিটে নারীদের ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

শুধু অস্ত্র নয়, চিকিৎসা ও উদ্ধারেও প্রশিক্ষণ

ইরানে নারীদের সামরিক প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো চিকিৎসা ও জরুরি সেবা। দেশটির সামরিক স্বাস্থ্য বিভাগে নারী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বিভিন্ন সামরিক মহড়ায় নারীদের আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে দেখা গেছে।

সামরিক চিকিৎসা ও উদ্ধার প্রতিযোগিতাতেও নারীদের অংশগ্রহণের নজির রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে যুদ্ধ বা বড় ধরনের দুর্যোগের সময় আহতদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তিতেও নজর

সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বসিজের নারী সদস্যদের শুধু প্রচলিত অস্ত্র নয়, ছোট ড্রোনসহ কিছু আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও অ্যান্টি-ট্যাংক ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রশিক্ষণের কথাও উঠে এসেছে।

তবে এসব প্রশিক্ষণের পরিধি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, প্রশিক্ষণের সময়কাল এবং তারা বাস্তবে কোনো সামরিক ইউনিটে কী ধরনের দায়িত্ব পালন করবেন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য সীমিত।

সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এ কারণে ইরানের নারী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর পরিবর্তিত চরিত্র। আগে যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ মূলত চিকিৎসা, প্রশাসন, যোগাযোগ ও সামাজিক সহায়তার মধ্যে সীমিত ছিল, সেখানে এখন স্থানীয় প্রতিরক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

বসিজে আলাদা নারী ইউনিট

ইরানের বিপ্লবী গার্ড-সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বসিজের বিভিন্ন কাঠামোতে নারীদের জন্য আলাদা ইউনিট গড়ে তোলার খবরও এসেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে তেহরানে নারী সদস্যদের নিয়ে বিশেষ বসিজ ইউনিট বা ব্যাটালিয়ন গঠনের কথা বলা হয়েছে।

এসব ইউনিটের সম্ভাব্য দায়িত্বের মধ্যে স্থানীয় নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এর বড় অংশই নিয়মিত সেনাবাহিনীর সম্মুখযুদ্ধের পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিরক্ষা ও সহায়তা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে।

১৯৮৪ সালের আইনেই ছিল প্রশিক্ষণের সুযোগ

ইরানে নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণের বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। ১৯৮৪ সালের সামরিক-সেবা আইনে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পুরুষদের ওপর আরোপ করা হলেও নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগ রাখার বিধান রয়েছে। এর বাস্তবায়নে বসিজকে ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।

স্কুল পর্যায়েও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির বিষয়টি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার নীতি রয়েছে। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে এর বড় অংশ বেসামরিক প্রতিরক্ষা বা সিভিল ডিফেন্সকেন্দ্রিক।

অর্থাৎ ইরানের বর্তমান নীতিতে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক সেনাসেবা চালুর পরিবর্তে স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত ভূমিকার ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।

কেন এখন নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণে জোর?

ইরানের এই পরিবর্তনের পেছনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং সাম্প্রতিক সামরিক মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তেহরানকে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে শুধু নিয়মিত সামরিক বাহিনী নয়, সাধারণ জনগণের মধ্যেও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নারীদের ক্ষেত্রে পরিবার ও সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘দেশের সেবা’ করার একটি মডেলও প্রচার করা হচ্ছে।

এর ফলে নারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি এখন শুধু সামরিক বাহিনীতে চাকরির প্রশ্ন নয়; বরং স্থানীয় প্রতিরক্ষা, চিকিৎসা, উদ্ধার, যোগাযোগ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো বিস্তৃত প্রস্তুতির অংশ হয়ে উঠছে।

সম্মুখযুদ্ধে পাঠানোর পরিকল্পনা কতটা?

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে ইরানে নারীদের ব্যাপকভাবে নিয়মিত যুদ্ধ ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত করে সম্মুখসমরে পাঠানোর কোনো সুস্পষ্ট সরকারি নীতি দেখা যায় না। বরং তাদের ভূমিকা মূলত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা, চিকিৎসা, উদ্ধার, যোগাযোগ, স্থানীয় নিরাপত্তা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা রয়েছে।

তবে অস্ত্র ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক সংঘাত আরও তীব্র হলে এই নারী স্বেচ্ছাসেবী ইউনিটগুলো কী ধরনের দায়িত্ব পাবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অবস্থান কতটা আলাদা?

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে নারীদের সামরিক অংশগ্রহণের মাত্রা এক নয়। কোথাও নারীরা মূলত স্বেচ্ছাসেবী বা সহায়ক ভূমিকায় থাকেন, আবার কোথাও নিয়মিত সামরিক বাহিনীতে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি।

ইরানের বর্তমান উদ্যোগের বৈশিষ্ট্য হলো—নারীদের বাধ্যতামূলক সেনাসেবায় না এনে বসিজের মতো স্বেচ্ছাসেবী কাঠামোর মাধ্যমে সামরিক ও জরুরি প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করা। এর সঙ্গে স্থানীয় নিরাপত্তা ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও একীভূত করা হচ্ছে।

ফলে ইরানে নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণকে শুধু সেনাবাহিনীতে নারীর প্রবেশ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বরং এটি দেশের বৃহত্তর ‘জনসম্পৃক্ত প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি’ কাঠামোর একটি অংশ হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।

এমইউ
আরও পড়ুন