যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে ইউটিলিটি বিল

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ায় বিদ্যুৎ, পানি ও গরমের বিল ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। চলতি বছরেই বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, চাপ বাড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ও।

রাশিয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি সেবার বিল। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে এসব সেবার খরচ ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। শুধু চলতি বছরেই বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। ফলে সংসারের মাসিক বাজেট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক পরিবার।

মস্কোর বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী ইতিহাসের শিক্ষক পোলিনা ইব্রাগিমোভার অভিজ্ঞতা এ পরিস্থিতির একটি উদাহরণ। দুই সন্তানের এই মায়ের কাছে সম্প্রতি এমন একটি ইউটিলিটি বিল আসে, যার পরিমাণ তাঁর মাসিক বেতনের অর্ধেকেরও বেশি। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, গোসলের সময় শিশুরা অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করায় বিল বেড়েছে। পরে বিলের হিসাব খতিয়ে দেখে বুঝতে পারেন, মূল কারণ সেবার মূল্যবৃদ্ধি।

রয়টার্সকে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর জন্য বেশ অস্বস্তিকর। পরিবারের খরচ সামলাতে এখন ব্যক্তিগতভাবে আরও একজন শিক্ষার্থী পড়ানোর কথা ভাবছেন তিনি।

ইব্রাগিমোভার ইউটিলিটি বিল গ্রীষ্মের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ১২ হাজার রুবলে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১৫০ ডলার। তাঁর মাসিক বেতনের অগ্রিম অংশ সাধারণত মোট বেতনের অর্ধেকের কাছাকাছি। এখন সেই অর্থ দিয়েও ইউটিলিটি বিল মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে যুদ্ধকালীন ব্যয়ের চাপের মধ্যে রয়েছে। শ্রমবাজারে কর্মীর সংকট এবং সামরিক খাতে বাড়তি ব্যয় পণ্যের দাম ও সেবার খরচ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি।

রাশিয়ায় সাধারণত প্রতি বছর গরম, পানি ও বিদ্যুতের ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও চূড়ান্ত মূল্যবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ।

তবে এ বছর সেপ্টেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পিছিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে ১ অক্টোবর থেকে নতুন ট্যারিফ কার্যকর হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলম্বের পর বিভিন্ন অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ ইউটিলিটি কোম্পানিগুলোর মূল্যস্ফীতিজনিত ব্যয় পুষিয়ে নিতে কয়েক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু মূল্যবৃদ্ধির অনুমোদন দেয়।

ইউটিলিটি বিলের এই বৃদ্ধি রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকেও কঠিন করে তুলছে। দেশটির নীতিনির্ধারকদের কাছে মূল্যস্ফীতি এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা।

গত ২৩ অক্টোবর সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা সতর্ক করেন, ইউটিলিটি ট্যারিফের বৃদ্ধি মানুষের ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে প্রত্যাশা বাড়াতে পারে। এ প্রত্যাশা সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার মূল সুদের হার বর্তমানে ১৪ শতাংশ। উচ্চ সুদের হার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদ দিমিত্রি পোলেভয়ের মতে, ইউটিলিটি সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হতে পারে।

এদিকে গত বছর মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে রাশিয়ার। চলতি বছর ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় দেশটির তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পেট্রলের দামেও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

ইউটিলিটি বিল বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে পরিবারগুলোকে দৈনন্দিন ব্যয় কমাতে নানা কৌশল নিতে হচ্ছে।

পোলিনা ইব্রাগিমোভা জানান, আগের তুলনায় এখন একটি মুরগি বেশি ভাগে কেটে রান্না করেন, যাতে পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার বেশি দিন চালানো যায়। নিজের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর মনে হচ্ছে তিনি যেন সোভিয়েত আমলের এক গৃহিণীতে পরিণত হয়েছেন।

রাশিয়ায় ইউটিলিটি সেবার খরচ ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় এখনো কম। দেশটিতে প্রচুর সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাস থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ঘর গরম করার খরচ তুলনামূলক কম। তবে ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় রাশিয়ার গড় মজুরিও কম। ফলে বিল বৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের কাছে বড় হয়ে উঠছে।

ইউটিলিটি বিল বৃদ্ধির সমালোচনা শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্রেমলিনপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু রাজনীতিকও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা গেন্নাদি জিউগানভ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক বৈঠকে ইউটিলিটি ট্যারিফ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, মস্কোয় সোভিয়েত আমলের একটি অ্যাপার্টমেন্টের জন্য তাঁর নিজের ইউটিলিটি বিল ৩০ হাজার রুবলের বেশি হয়েছে, যা দেশটির গড় পেনশনের চেয়েও বেশি।

পার্লামেন্টের স্পিকার ভিয়াচেস্লাভ ভোলোদিনও কয়েকটি অঞ্চলে অতিরিক্ত হারে মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রসিকিউটর এবং অ্যান্টি-মনোপলি কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ইউটিলিটি ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও। সরকারি বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে কর বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা একাধিক দিক থেকে চাপে পড়ছেন।

মস্কোর একটি বারের ব্যবস্থাপক আনাস্তাসিয়া জাপোতেয়েভা বলেন, নতুন করে ব্যবসা শুরু করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইউটিলিটি বিল বৃদ্ধি বিশেষভাবে কষ্টকর। কারণ, এর পাশাপাশি অন্যান্য খরচও বাড়ছে।

সব মিলিয়ে রাশিয়ায় যুদ্ধকালীন অর্থনীতির প্রভাব এখন সাধারণ মানুষের মাসিক বিদ্যুৎ-পানি-গরমের বিল থেকে শুরু করে খাবারের বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যয়েও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চললেও নতুন ট্যারিফ বৃদ্ধি দেশটির পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন