যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের পরাজয় এবং কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর চাঙা হয়ে উঠেছে দেশটির শেয়ারবাজার। ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের অবসানের প্রত্যাশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামেও বড় পতন হয়েছে।
বুধবারের (৪ নভেম্বর) লেনদেন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারসূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী ছিল। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, ডাও জোন্স সূচক ১ হাজার ৫৬৯ পয়েন্ট বা ৩ শতাংশ বেড়ে ৫৩ হাজার ৩৫৬ দশমিক ১২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৬২ পয়েন্টে এবং নাসডাক সূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২৫ হাজার ৭৩৬ দশমিক ৫১ পয়েন্টে পৌঁছায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। কর, সরকারি ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের বাধা বা বাড়তি নজরদারির সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছে।
বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছে, কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনের আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনের ঝুঁকি কমতে পারে। বিশেষ করে করছাড়, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো উদ্যোগে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারের সব খাত সমানভাবে লাভবান হবে। ডেমোক্র্যাটরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল সম্পদের ওপর কঠোর নজরদারির উদ্যোগ নিতে পারে। এতে প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এআই এখনো ওয়াল স্ট্রিটের অন্যতম বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র। কিন্তু এআই অবকাঠামো, বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস ডেটা সেন্টার নির্মাণ, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও পরিবেশগত প্রভাবের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। এতে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট ও মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সেমিকন্ডাক্টর সূচক ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। টেসলার শেয়ারও দর হারিয়েছে।
অর্থাৎ এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকলেও অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়, নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়গুলো নতুন করে হিসাবের মধ্যে আসছে।
নির্বাচনের পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি দেখা গেছে জ্বালানি বাজারে। ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও ৮ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ ডলারের কাছাকাছি দাঁড়ায়।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব পড়েছিল তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতে। নির্বাচনী ফলের পর যুদ্ধের অবসরের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদ তেলের বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তেলের দাম কমলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে। এতে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও কমতে পারে।
তবে এই আশাবাদ মূলত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আবার বাড়লে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
সরকারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে
নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা বন্ড কেনায় ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার কমে প্রায় ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশে নেমেছে।
বন্ডের দাম ও মুনাফার হার সাধারণত বিপরীতমুখী। অর্থাৎ বন্ডের চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে এবং মুনাফার হার কমে।
বিনিয়োগকারীদের ধারণা, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত ব্যয় ও করছাড়ের উদ্যোগে বাধা আসতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা কিছুটা কমবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে বাজারে উদ্বেগ রয়েছে। নতুন ঋণ গ্রহণের চাপ কমার সম্ভাবনা বন্ড বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি দিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও সরকারি ব্যয়ের চাপ এখনো বড় ঝুঁকি।
প্রতিরক্ষা খাতেও অনিশ্চয়তা
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় এই বিশাল ব্যয় পরিকল্পনা অনুমোদন পাওয়া কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে চাপ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্পের শুল্কনীতি, ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং এআই খাতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে।
বাজারের স্বস্তি কতটা স্থায়ী?
নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি তৈরি করলেও সামনে বেশ কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে মতবিরোধ বাড়লে সরকারি কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের নতুন করে বিস্তার, এআই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কিংবা সরকারি ঋণের চাপ বাজারের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
তাই নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারের উত্থানকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চূড়ান্ত প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জনে শক্তিশালী ইরান গড়ার বিকল্প নেই: মোজতবা খামেনি
বিপক্ষ শক্তিকে অস্ত্রের পাল্লা দিয়ে বিচার করলে যুক্তরাষ্ট্র বড় ভুল করবে: জেনারেল গানী
কয়েক দশক ধরে ইরানের সম্পদ শোষণের চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র: খামেনি
ইরান নিয়ে ৩ বিকল্পের মুখে ট্রাম্প: হামলা, সমঝোতা নাকি অর্থনৈতিক চাপ
'ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ে উদ্বেগ অথচ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় নীরব কেন গ্রোসি'