জোয়ারের পানিতে বিচ্ছিন্ন জনপদ, চিকিৎসার অভাবে প্রসূতির মৃত্যু

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

চারদিকে শুধু জোয়ারের পানি। গ্রামের রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে যান চলাচল। এমন পরিস্থিতিতে প্রসববেদনায় ছটফট করছিলেন নাজমা আক্তার (৩০)। পরিবারের সদস্যরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাকে হাসপাতালে নিতে পারেননি। অবশেষে চিকিৎসার অভাবে নিজের ঘরেই নিভে যায় নাজমার জীবন। তার সঙ্গে পৃথিবীর আলো দেখা হলো না গর্ভের সন্তানেরও। দুটি প্রাণের মৃত্যুর পর পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রতিবেশীদের চোখে ছিল অসহায়ত্বের ছাপ।

বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর গ্রামে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। নিহত নাজমা ওই গ্রামের জেলে মো. হক সাবের স্ত্রী।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারে নিঝুমদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। গত দুই দিনে পানি কিছুটা কমলেও বুধবার দুপুরে আবারও জোয়ারের পানিতে ইসলামপুর গ্রামের অধিকাংশ সড়ক ও চলাচলের পথ ডুবে যায়। এতে পুরো এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এমন অবস্থায় বুধবার সকালে নাজমার প্রসববেদনা শুরু হয়। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু চারদিকে পানি আর ডুবে থাকা সড়কের কারণে কোনো যানবাহন পাওয়া যায়নি। বিকল্প কোনো উপায়ও ছিল না। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক জটিলতায় ঘরেই মারা যান নাজমা। তাঁর গর্ভের সন্তানও বাঁচেনি।

স্বজনরা জানান, এটি ছিল নাজমার তৃতীয় সন্তান। এর আগে তার দুটি সন্তান রয়েছে। নতুন অতিথিকে ঘিরে পরিবারে ছিল আনন্দ আর অপেক্ষা। কিন্তু সেই অপেক্ষা মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই নিঝুমদ্বীপের বহু এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় প্রসূতি, শিশু, বৃদ্ধ ও গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। নাজমার মৃত্যু সেই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা সংকটের আরেকটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে থাকল।

স্থানীয় ইউপি সদস্য কেফায়েত হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক জোয়ার ও জলাবদ্ধতায় নিঝুমদ্বীপের নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক এলাকায় সড়ক পানির নিচে থাকায় জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নাজমার মৃত্যু সেই দুর্ভোগেরই করুণ বাস্তবতা।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লাভলী আক্তার বলেন, নাজমার আগে দুটি সন্তান রয়েছে। এবার ছিল তার তৃতীয় সন্তান প্রসবের সময়। কিন্তু চারপাশে জোয়ারের পানি থাকায় ঘর থেকে বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। উন্নত হাসপাতাল তো দূরের কথা, একটি নিরাপদ সড়কও নেই। ফলে ঘরেই মা ও গর্ভের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে অবকাঠামোগত সংকটের কারণে নিঝুমদ্বীপের মানুষ এমন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে যোগাযোগব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

MCH/AHA
আরও পড়ুন