কালীগঞ্জ উপজেলার তালিয়া গ্রামে নির্মিত ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ভবন থাকলেও সেখানে কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা চালু না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশে ঘন জঙ্গল ও আগাছায় ভরা পরিবেশ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সেখানে শিয়ালের ডাক এবং সাপের আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাইরে থেকে ভবনটি নতুন ও পরিপাটি মনে হলেও ভেতরে ঢুকলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। দোতলা ভবনের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে বাউন্ডারি ওয়ালের ভেতর পর্যন্ত আগাছায় ঢেকে গেছে।
হাসপাতালে নেই কোনো চিকিৎসক, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী। জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ওয়ার্ডগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। শয্যাগুলোর ওপর জমে আছে ধুলা। কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাসপাতালটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ শেষ হলেও আজ পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। ফলে সাধারণ রোগেও তাদের কয়েক কিলোমিটার দূরের উপজেলা কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ—দুটোরই অপচয় হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশু রোগীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ফুরিয়া বেগম বলেন, ‘বাড়ির পাশেই হাসপাতাল, কিন্তু চিকিৎসা নিতে হয় দূরে গিয়ে। এত কষ্ট করে গিয়ে আবার ঠিকমতো চিকিৎসাও পাওয়া যায় না।’
আরেক বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘জীবনে এমন ঘটনা দেখিনি। হাসপাতাল বানানো হলো, অথচ কোনো কার্যক্রমই নেই।’
তালিয়া গ্রামের শিউলি আক্তার জানান, হাসপাতালটি এখন পুরোপুরি পরিত্যক্ত। তিনি বলেন, চারপাশ জঙ্গলে ভরে গেছে, রাতে শিয়ালের ডাকাডাকি হয়। আক্রমণের ভয় থাকে। ভেতরে কেউ ঢুকতে পারে না। যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি রুম ও মেইন গেটে তালা ঝুলছে।’
উলুখলা বাজারের মুদি দোকানি অরুণ বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে দূরে যাচ্ছে। কষ্টের কোনো হিসাব নেই।
হাসপাতালের জমিদাতা মুক্তার হোসেন বলেন, ‘আমার পরিবার এই হাসপাতালের জন্য প্রায় দুই একর জমি দিয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল চালু না হওয়ায় মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে না। জমি দিয়ে কী লাভ হলো?’
তিনি আরও জানান, তালিয়া গ্রামের পাশাপাশি নগর বালা, মেঘবাড়ী, সেনপাড়া, রায়েরদিয়া ও গায়েনবাড়ীসহ আশপাশের অন্তত পাঁচটি গ্রামের মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল ছিল। চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় এসব এলাকার মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে হাসপাতালটি চালু করা হোক।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স–এর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রিজওয়ানা রশীদ জানান, ‘২০ শয্যা বিশিষ্ট ওই হাসপাতালে একজন আরএমও, একজন চিকিৎসক ও দুইজন নার্স থাকার কথা ছিল। একজন পরিচালক ছিলেন, তবে বেতন না পাওয়ায় তিনি বদলি হয়ে চলে গেছেন। ২০২০ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং ২০২১ সালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’
এদিকে গাজীপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘হাসপাতাল চালু করতে আলাদা অর্থনৈতিক কোড প্রয়োজন হয়। এই হাসপাতালের কোড পাওয়া গেলেও এখনো ওষুধের বরাদ্দ ও লোকবল পোস্টিং হয়নি। এ কারণেই হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হয়নি।’

