মানুষের জীবনে সব হারানোর বেদনা হয়তো একদিনে আসে না। ধীরে ধীরে প্রিয়জন হারায়, সংসারের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়, পরিচিত মুখগুলো দূরে সরে যায়। একসময় যে ঘরে হাসি, গল্প আর আপনজনের পদচারণায় দিন কেটেছে, সেই ঘরই নীরবতার ঠিকানায় পরিণত হয়।
ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার ‘চৌধুরী ভিলা’র বাসিন্দা কোয়েল চৌধুরীর (৫৪) জীবন যেন এমনই এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার গল্প। শেষ পর্যন্ত সেই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই থেমে গেল তাঁর জীবন। আর জীবনের শেষ বিদায়ে, রক্তের সম্পর্ক নয়, শেষ দায়িত্ব পালন করলেন প্রতিবেশী আর এলাকার মানুষ।
রোববার (১২ জুলাই) সকালে প্রতিদিনের মতো এক ভাড়াটিয়া তাঁর জন্য খাবার নিয়ে উপরের ফ্ল্যাটে যান। অনেকক্ষণ দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। বিষয়টি জানানো হয় আশপাশের বাসিন্দাদের। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে কোয়েল চৌধুরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে।
তাঁকে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দুই যুগ আগে সরকারি চাকরিজীবী হাশমত আলী চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী আছিয়া খানম এই বাড়িটি কিনে বসবাস শুরু করেন। তিন সন্তান নিয়ে ছিল ছোট্ট একটি সুখের পরিবার। সময়ের ব্যবধানে বাবা-মা দুজনই মারা যান। একমাত্র মেয়ে স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাস শুরু করেন। দুই ছেলে বাবু চৌধুরী ও কোয়েল চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন।
এলাকার মানুষের কাছে দুই ভাই ছিলেন পরিচিত মুখ। প্রায়ই তাঁদের পাশাপাশি হাঁটতে দেখা যেত। একজন যেন আরেকজনের ছায়া। একসঙ্গে বাজারে যাওয়া, রাস্তায় হাঁটা কিংবা চুপচাপ বসে থাকা দুই ভাইয়ের এই সঙ্গই ছিল তাঁদের পৃথিবী।
কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যু হলে কোয়েল চৌধুরী যেন আরও একা হয়ে পড়েন। বিশাল তিনতলা বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে একাই দিন কাটত তাঁর। নিজের দেখভালের মতো ঘনিষ্ঠ কেউ ছিলেন না। ভবনের ভাড়াটিয়ারাই নিয়মিত খাবার পৌঁছে দিতেন, প্রতিবেশীরা খোঁজখবর নিতেন, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতেন।
প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান বলেন, ‘সকালে খাবার দিতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। পরে ৯৯৯-এ ফোন করি। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান, তিনি আর বেঁচে নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কানাডায় থাকা তাঁর একমাত্র বোনকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তিনি দাফনের ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। আত্মীয়স্বজনদেরও খবর দেওয়া হয়, কিন্তু শেষ বিদায়ে কেউ উপস্থিত হননি। পরে এলাকার মানুষ মিলে আলীপুর কবরস্থানে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। দাফন শেষে দূরসম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন।’
স্থানীয়দের কাছে প্রচলিত একটি গল্প রয়েছে শৈশবে বাবা-মা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে দুই সন্তানকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে রেখে যেতেন, যা তাঁদের পরবর্তী জীবনে মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে ধারণা করেন। তবে এ বিষয়ে কোনো চিকিৎসাগত নথি বা সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, ‘৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। পরে চিকিৎসকেরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।’
কোয়েল চৌধুরীর মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যুর খবর নয়; এটি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া বহু মানুষের জীবনের এক নীরব প্রতিচ্ছবি। নিজের নামে তিনতলা বাড়ি ছিল, ছিল সচ্ছলতার স্মৃতি, ছিল একসময় ভরা সংসার। অথচ জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে ছিল না কোনো আপনজন। শেষ যাত্রায় কাঁধ মিলিয়েছেন প্রতিবেশীরা যাঁরা রক্তের সম্পর্কে না হলেও মানবিকতার বন্ধনে হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে আপন।
এই ঘটনাটি যেন আবারও মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য রক্তের বন্ধনে নয়, বিপদের দিনে কে পাশে দাঁড়ায়, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
গাছ কাটতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল এক কাঠুরের
টঙ্গীর মাজার বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার ২০
জ্ঞানচর্চার নতুন ঠিকানা ‘হারুন আল রশিদ (বিএসসি) পাঠাগার’
দৌলতপুরে বিজিবির উদ্যোগে ১০০ অসহায় পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ
বেতন বৃদ্ধি ও বিভাগীয় কর্মচারীর স্বীকৃতির দাবিতে ডাক কর্মচারীদের ধর্মঘট