আগুনে পুড়েছে দোকান, নেভেনি সাব্বিরের হালাল রিজিকের স্বপ্ন

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। ঘড়ির কাঁটা তখন পৌনে চারটা। হঠাৎই গাজীপুরের কাপাসিয়া কেন্দ্রীয় বাজারের মসজিদ মার্কেট-সংলগ্ন গলিতে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ঘুম ভাঙে পুরো বাজারের। কেউ দোকানের শাটার ভাঙার চেষ্টা করছেন, কেউ বালতি হাতে আগুন নেভানোর লড়াইয়ে যোগ দিয়েছেন, আবার কেউ অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দেখেছেন বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলো আগুনে ভস্মীভূত হচ্ছে।
 
প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে পুড়ে যায় অন্তত আটটি দোকান, একটি বসতবাড়ি এবং কাপাসিয়া বাজার জামে মসজিদের আংশিক অংশ। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত।
 
এই আগুন শুধু দোকান বা মালামাল পুড়িয়ে দেয়নি; কেড়ে নিয়েছে বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন। তাঁদের একজন তরুণ উদ্যোক্তা সাব্বির মোল্লা।
একসময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে কর্মরত ছিলেন সাব্বির মোল্লা। স্থায়ী আয় ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ থাকলেও চাকরির কিছু কার্যক্রমে সুদের সংশ্লিষ্টতা থাকায় নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করতে চাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে হালাল উপার্জনের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মোল্লা হালাল ফুড’।
 
অর্গানিক খাদ্যপণ্য, হজযাত্রীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ইসলামিক পণ্য নিয়ে শুরু হওয়া ছোট্ট উদ্যোগটি ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করে। পরে তিনি ‘ঘাসফড়িং পাঞ্জাবি’ নামে দেশীয় ও ইসলামিক পোশাকের আরেকটি ব্যবসাও শুরু করেন। সততা ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে এগিয়ে যাচ্ছিল তাঁর উদ্যোগ।
 
অগ্নিকাণ্ডের সময় সাব্বির মোল্লা হাসপাতালে ছিলেন। ছেলের অপারেশনের কারণে রাতটি তাঁকে চিকিৎসাকেন্দ্রেই কাটাতে হয়েছিল। হঠাৎ ফোনে আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত বাজারে ছুটে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন, আগুন তাঁর দোকানের প্রায় সবকিছু গ্রাস করে ফেলেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলের অপারেশনের জন্য হাসপাতালে ছিলাম। সকালে খবর পেয়ে এসে দেখি দোকান আগুনে পুড়ে গেছে। আমার সব শেষ।’
 
সংক্ষিপ্ত এই বক্তব্যেই ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। আগুন নিভে গেছে, ধোঁয়াও মিলিয়ে গেছে। কিন্তু পোড়া টিন, কালো হয়ে যাওয়া দেয়াল আর ছাইয়ের স্তূপ যেন এখনো জানিয়ে দেয় এখানেই একসময় ছিল একটি স্বপ্নের ঠিকানা।
 
যে দোকানে মানুষ হালাল খাদ্যপণ্য কিনতে আসতেন, ঈদের আগে পাঞ্জাবি কিনে হাসিমুখে ফিরতেন, সেখানে এখন শুধু পোড়া গন্ধ আর নীরবতা। প্রাথমিক হিসাবে সাব্বির মোল্লার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
কাপাসিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম শাহিন জানান, আগুনে কাপড়, পাঞ্জাবি ও বিভিন্ন পণ্যের দোকান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
 
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, আব্দুল কাইয়ুমের দুটি দোকানে প্রায় ২০ লাখ, আজাহার আলীর দোকানে ১৫ লাখ, সরোয়ার হোসেনের দোকানে ২৫ লাখ, সাব্বির মোল্লার দোকানে প্রায় ১৫ লাখ এবং আবুল কাশেমের বসতবাড়িতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
 
ইসলামীয় পাঞ্জাবির ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রাসেল জানান, স্থানীয় মুসল্লিদের সহায়তায় কিছু মালামাল বের করতে পারলেও তাঁর প্রায় সাত লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
 
অগ্নিকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর ‘মোল্লা হালাল ফুড’-এর ফেসবুক পেজে একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণা দেওয়া হয়।অনির্দিষ্টকালের জন্য মোল্লা হালাল ফুডের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, সাব্বির মোল্লার গল্প এখানেই শেষ নয়। তাঁদের মতে, একজন সৎ উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাঁর ব্যবসা আবার সচল হওয়ার পর সেখান থেকে পণ্য কেনা, অর্ডার দেওয়া এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করা।
 
কাপাসিয়া ও রাজেন্দ্রপুর ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
 
কাপাসিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ইনচার্জ মাহফুজুর রহমান বলেন, আগুনে অন্তত আটটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কোটি টাকার উপরে হবে। কাপাসিয়া থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই) জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেছে। 
 
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কাপাসিয়া উপজেলার নবনিযুক্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেককে শুকনো খাবার, ১০ কেজি চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও প্রয়োজনীয় মসলা দেওয়া হয়। এ ছাড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচজন ব্যবসায়ীর পুনর্বাসনের জন্য ১০ বান্ডিল করে ঢেউটিন এবং ৩০ হাজার টাকা করে নগদ অনুদান প্রদান করা হয়।
 
ইউএনও হাফিজুল হক বলেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ড অত্যন্ত মর্মান্তিক। আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। উপজেলা প্রশাসন শুরু থেকেই ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে রয়েছে। জরুরি খাদ্যসামগ্রী, ঢেউটিন ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে তা পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যেকোনো দুর্যোগ ও সংকটে প্রশাসন সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।’
 
কাপাসিয়ার এই অগ্নিকাণ্ড বহু ব্যবসায়ীর জীবনে এক কঠিন অধ্যায় হয়ে থাকবে। তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও সাব্বির মোল্লার গল্প মনে করিয়ে দেয় পুঁজি হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সততা, বিশ্বাস এবং নতুন করে শুরু করার সাহস হারিয়ে যায় না।
MCH
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত