দেশসেরা প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম

প্রতিদিন সকাল ৯টা বাজতেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে হাতে বাঁশি নিয়ে দাঁড়িয়ে যান তিনি। একে একে সারিবদ্ধ হয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীরা। এরপর জাতীয় সংগীত, শারীরিক কসরত এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান—সবকিছুই চলে তার নিবিড় তত্ত্বাবধানে। শিক্ষকদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। এই শৃঙ্খলা ও নিবেদিত নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা-২০২৬-এ দেশের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (মহিলা) নির্বাচিত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত মূল্যায়নে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে তিনি পদক গ্রহণ করেন। এর আগে ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার এবং আটবার নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বি আর বিলকিস। ঢাকা বিভাগেও দুইবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তার।

দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন বি আর বিলকিস। তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার কমেছে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের ব্যবহার বেড়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী পরিবেশ।

দেশসেরা হওয়ার অনুভূতি জানিয়ে বি আর বিলকিস বলেন, যেকোনো কাজের স্বীকৃতিই আনন্দের। তবে এই অর্জন শুধু তার একার নয়; বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই সম্মান তাকে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষার মান আরও উন্নত করা এবং শিশুদের মেধা বিকাশে আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেবে।

১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন বি আর বিলকিস। পরে পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৩ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে তার জন্ম। উপজেলার পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষকতায় তার দীর্ঘ ৩৩ বছরের পথচলা পেরিয়েছে ১৯৯৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত।

বর্তমানে ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ হাজার ২০ জন। বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন ১৩ জন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ। প্রতি রোববার পালন করা হয় ‘হ্যাপি সানডে’। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ পড়াশোনা শ্রেণিকক্ষেই সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে বছরের শুরুতেই তাদের তিন স্তরে ভাগ করা হয়—উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া। পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া হয় বিশেষ ক্লাস। বিদ্যালয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়তে ও লিখতে পারে। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করা হয়। পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের শিক্ষকসংখ্যা অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের অগ্রগতি জানতে শিক্ষকরা রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়িতেও যান।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সহায়ক হিসেবে রয়েছে সততা স্টোর ও পরামর্শ বক্স। শ্রেণিকক্ষগুলো সাজানো-গোছানো। বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ ও সিঁড়িতে লেখা রয়েছে ইতিবাচক ও ভালো কথার বার্তা। অভিভাবকরাও বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন। ২০২৫ সালে বিদ্যালয়টির ৩৪ শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩০ জন বৃত্তি পেয়েছে।

বিদ্যালয়ের সময়নিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বি আর বিলকিসের রয়েছে আলাদা নজির। তিনি নিয়মিত সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছান এবং বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাড়ি ফেরেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণও দেন। পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও গল্প বলার সুযোগ দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতা বাড়াতে বিদ্যালয়ে রয়েছে বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব ও ইংরেজি ক্লাব। এসব ক্লাবের মাধ্যমে অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞান মেলারও আয়োজন করা হয়। প্রতি শনিবার শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়।

প্রযুক্তির ব্যবহারও রয়েছে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে। শ্রেণিভিত্তিক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ দেওয়া হয়। ফলে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে বাড়ির কাজ লিখে নিতে না পারলেও অভিভাবকরা তা জানতে পারেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শামীমা আক্তার বলেন, বি আর বিলকিসের দেশসেরা হওয়ার পেছনে রয়েছে তার শৃঙ্খলা। তিনি শিক্ষাবান্ধব এবং সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে পছন্দ করেন। বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও নিজের জন্য সময় না দিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেন।

শিক্ষিকা মাহামুদা আক্তার বলেন, তিনিও একসময় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, এখন এখানেই শিক্ষকতা করছেন। তার চোখে বি আর বিলকিস একজন কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে তিনি নিয়মিত নতুন নতুন চিন্তা ও উদ্যোগ নিয়ে কাজ করেন। শিক্ষকদের নিয়ে সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সভা করে কীভাবে পাঠদান আরও ফলপ্রসূ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা নিয়েও গুরুত্ব দেন।

শিক্ষক কবির হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক। দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

অভিভাবক কেয়া মৌল্লিক মৌমিতা বলেন, প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় প্রধান শিক্ষক নিজে ফটকে দাঁড়িয়ে থাকেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও নৈতিক শিক্ষার প্রতিও তিনি গুরুত্ব দেন। তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেক সুন্দর হয়েছে। ফলে সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগও আগের তুলনায় কমেছে।

শিক্ষার্থী ফারাজ ইবনে বশির জানায়, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করান। বিদ্যালয়ে ভাষা ক্লাব, বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব ও ইংরেজি ক্লাব পরিচালিত হয়। পাশাপাশি রয়েছে ছাদবাগান। শিক্ষার্থীরাও ছাদবাগান করা ও বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে প্রধান শিক্ষককে সহযোগিতা করে।

প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের কাজে উৎসাহিত করতে প্রতিবছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক দেওয়া হয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত মূল্যায়নের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠদের নির্বাচন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার দেশের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (মহিলা) হয়েছেন বি আর বিলকিস।

এমইউ
আরও পড়ুন