সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা। কাঁচা রাস্তার জায়গায় হয়েছে পাকা সড়ক, সেতু আর আধুনিক যানবাহন পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত এলাকায়। তবুও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বর্ণি বাওড়ে আজও থেমে যায়নি খেয়া নৌকার বৈঠা। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের অন্যতম নির্ভরতা হয়ে আছে এই খেয়া। আর সেই নৌকার বৈঠা হাতে জীবিকার সংগ্রাম করে চলেছেন বাকপ্রতিবন্ধী মাঝি মো. রসুল খান।
বর্ণি ইউনিয়নের বাসিন্দা রসুল খান বহু বছর ধরে বর্ণি বাওড়ে খেয়া নৌকা চালিয়ে আসছেন। কথা বলতে না পারলেও তার বৈঠার ভাষা বুঝে নিয়েছেন এই জনপদের মানুষ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষসহ নানা পেশার যাত্রীরা তার নৌকায় পারাপার হন। প্রতিটি যাত্রার জন্য তিনি নেন মাত্র ১০ টাকা ভাড়া।
প্রতিদিন যাত্রী পারাপার করে রসুল খানের আয় হয় গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে সপ্তাহে দুই দিন কুশলী হাট বসলে যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। সেদিনগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একের পর এক মানুষ পারাপার করতে হয় তাকে। ফলে আয়ও কিছুটা বাড়ে, যা দিয়ে কোনো রকমে চলে তার পরিবারের সংসার।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে যখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে খেয়া নৌকার সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তখন টুঙ্গিপাড়ার বর্ণি বাওড়ে এখনো টিকে আছে শতবর্ষের সেই ঐতিহ্য। আর সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন নীরবে বৈঠা চালিয়ে যাচ্ছেন বাকপ্রতিবন্ধী মাঝি মো. রসুল খান। তার বৈঠার প্রতিটি টান যেন শুধু মানুষকে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে পৌঁছে দেয় না, বহন করে নিয়ে চলে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক জীবন্ত ঐতিহ্যের গল্প।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, এই খেয়া শুধু একটি নৌকা নয়, বরং দুই ইউনিয়নের মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই পথে কালাম শেখ, হাশেম ও কায়সারসহ একাধিক মাঝি খেয়া পরিচালনা করেছেন। সময়ের পরিক্রমায় তারা সরে গেলেও বর্তমানে একাই নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন রসুল খান। তার অনুপস্থিতিতে অনেক সময় মানুষের চলাচলই ব্যাহত হয়।
আরেক বাসিন্দা ও এই বাওরে নৌকায় প্রতিনিয়ত যাতায়াত করা রহমান মিয়া বলেন, বর্ণি বাওড়ের ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। একসময় মধুমতী নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয় এই বিশাল বাওড়। সময়ের সঙ্গে এটি শুধু একটি জলাভূমি হিসেবে নয়, বরং বর্ণি ও কুশলী ইউনিয়নের মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে। পাশাপাশি দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত এই বাওড়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বিস্তীর্ণ জলরাশি আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
স্থানীয় প্রবীণরা আক্কাস আলী বলেন, কয়েক দশক আগেও এই খেয়াই ছিল দুই পাড়ের মানুষের একমাত্র ভরসা। এখন সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হলেও বাওড়ের দুই পাশের মানুষের জন্য খেয়া নৌকার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। বরং প্রতিদিন শতাধিক মানুষ এখনো এই নৌকার ওপর নির্ভর করেন।
রসুল খানের জীবনের গল্পও অনেকটাই সংগ্রামের। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে না পারলেও প্রতিদিনের পরিশ্রমই যেন তার জীবনের ভাষা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৈঠা চালিয়ে যাত্রীদের নিরাপদে পারাপার করাই তার নিত্যদিনের কাজ। মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান জীবিকার নিশ্চয়তা।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে যখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে খেয়া নৌকার সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তখন টুঙ্গিপাড়ার বর্ণি বাওড়ে এখনো টিকে আছে শতবর্ষের সেই ঐতিহ্য। আর সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন নীরবে বৈঠা চালিয়ে যাচ্ছেন বাকপ্রতিবন্ধী মাঝি মো. রসুল খান। তার বৈঠার প্রতিটি টান যেন শুধু মানুষকে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে পৌঁছে দেয় না, বহন করে নিয়ে চলে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক জীবন্ত ঐতিহ্যের গল্প।
রাজপথ জ্বললে ছারখার হবে অনেক কিছু: জামায়াত আমিরের হুঁশিয়ারি
উলিপুরে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি গাছ কাটার অভিযোগ
চুয়াডাঙ্গায় বিরিয়ানির দোকানে ভোক্তা-অধিকারের অভিযান, জরিমানা