মাত্র সাত মাস বয়সে যে শিশুটির শরীরে বাসা বেঁধেছিল জটিল রোগ, সেই জুঁই খাতুনের জীবনের ১৫টি বছর কেটেছে অসুস্থতা আর চিকিৎসার সংগ্রামে। এখন তার বয়স প্রায় ১৫ বছর। এই বয়সে অন্য শিশুরা স্কুলে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে, ঘুরতে যায়, কিন্তু জুঁইয়ের দিন কাটে বিছানায় শুয়ে কিংবা অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস (কুলপাড়া) গ্রামের দিনমজুর পরিবারের সন্তান জুঁই। বাবা জুব্বার আলী অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালান। মেয়ের চিকিৎসার পেছনে দীর্ঘদিনের জমানো সামর্থ্য শেষ হয়ে গেছে পরিবারের। ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও এখন অর্থের অভাবে প্রায় তিন মাস ধরে জুঁইয়ের চিকিৎসা বন্ধ।
জুঁই বর্তমানে বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি সে।
জুঁইয়ের শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়। পেট ফুলে থাকে, প্রস্রাবের সমস্যায় ভুগতে হয়, বারবার সংক্রমণ হয়। রাতে ঘুমাতে পারে না। কখনো কখনো শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। বয়স অনুযায়ী তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিও হয়নি।
ভাঙা কণ্ঠে জুঁই বলে, তার পেট ও শরীরের পাশে ব্যথা করে, পেট ফুলে আছে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তবু তার ছোট্ট কিছু স্বপ্ন আছে, সুস্থ হয়ে আবার স্কুলে যাবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে, ঘুরতে যাবে। সেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকুতিই এখন তার সবচেয়ে বড় চাওয়া।
জুঁইয়ের মা রিনা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েটা সাত মাস বয়স থেকেই অসুস্থ। পেট ফুলে যায়, প্রচণ্ড ব্যথা করে, চোখ-মুখ ফুলে যায়। প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে ওর কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তখন বসতে পারে না, শুতে পারে না, ঘুমাতেও পারে না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের যা কিছু ছিল, প্রায় সবই শেষ হয়ে গেছে। এখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো অর্থও তাদের হাতে নেই।
জুঁইয়ের বাবা জুব্বার আলী দিনমজুরি করে সংসার চালান। মেয়ের চিকিৎসার জন্য জমিজমা, গাছপালা ও অন্যান্য সামান্য সম্পদও বিক্রি করেছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। আত্মীয়স্বজনও দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু এখন তাদেরও সামর্থ্য ফুরিয়ে এসেছে।
জুঁইয়ের বড় মা ঝরণা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটিকে অসহ্য কষ্ট করতে দেখছেন তারা। বর্তমানে তার পেট, চোখ ও মুখ ফুলে গেছে। রাতে যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারে না। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য পরিবারের নেই।
চাচী লিপি খাতুন বলেন, ‘ওর কষ্ট চোখে দেখা যায় না। রাতে ঘুমাতে পারে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমরা আত্মীয়স্বজন মিলে যতটা পেরেছি সাহায্য করেছি। এখন আর পারছি না।’
জুঁইয়ের চাচা শামিম বলেন, জুঁইয়ের চিকিৎসার জন্য পরিবারের যা কিছু ছিল, তারা প্রায় সবই বিক্রি করেছেন। এখন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সমাজের মানুষের সহযোগিতাই তাদের একমাত্র ভরসা।
বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবর আলী বলেন, জুঁই সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি। তিনি আশা করেন, সহৃদয় মানুষ এগিয়ে এলে জুঁই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবে।
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন বলেন, পরিবারটি অত্যন্ত অসচ্ছল। জুঁই দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেছেন। জুঁইয়ের চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবান মানুষ, প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক জানান, নেফ্রোটিক সিনড্রোম একটি পরিচিত রোগ। রোগটির ধরন নির্ণয়ের জন্য বায়োপসি প্রয়োজন হতে পারে। রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে জুঁই ভালো হয়ে উঠুক এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
জুঁই এখন কারও করুণা নয়, একটি স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ চায়। আবার স্কুলে যেতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায়, হাসতে চায়। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসার খরচে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবারটির পক্ষে একা সেই লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জুঁইয়ের চিকিৎসার জন্য এখন মানুষের সহযোগিতাই তার পরিবারের শেষ ভরসা। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ মানবিক মানুষগুলো এগিয়ে এলে হয়তো দীর্ঘ ১৫ বছরের অসুস্থতার পর জুঁই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পাবে।
সহযোগিতা করতে যোগাযোগ:
পরিবারের বিকাশ নম্বর: ০১৭৭১-৭৪৫৬০১
খুলনায় ব্যবসায়ীসহ সাতজনের ১০ বছরের কারাদণ্ড
বিজিবি ক্যাম্পে ঢুকে ড্রেজার ছিনতাইয়ের চেষ্টা, আটক ৬
কালীগঞ্জে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যু
কর্মস্থলে অনুপস্থিত, বরিশালে দুই ভূমি কর্মচারী স্ট্যান্ড রিলিজ