চাকরির পরীক্ষায় যেসব জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে পরীক্ষার্থীরা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে জালিয়াতির ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। প্রশ্নফাঁস থেকে শুরু করে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রক্সি পরীক্ষার্থী বসানো, ভুয়া প্রবেশপত্র ব্যবহার এবং নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষার উত্তর সংগ্রহ—বিভিন্ন কৌশলে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন কেউ কেউ। এসব অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। একই সঙ্গে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন প্রকৃত প্রার্থীরা।

গত কয়েক মাসে সরকারি চাকরির একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে শতাধিক পরীক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক কিংবা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সরকারি চাকরিতে কর্মরত ব্যক্তিও রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও এসব ঘটনার পেছনে থাকা মূল কারিগরদের অনেকেই এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন।

গত ১ আগস্ট সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী ব্যবহার করে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জুনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক এবং ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত জুলফিকার আলী ওরফে রায়হান। গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বিভাগীয় কর কমিশনারের কার্যালয়ের অধীন কর অঞ্চল-২-এর অফিস সহকারী নুরুন্নবী ও সোহেল।

চাকরিতে যোগদানের আগে প্রার্থীদের কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় তাদের আবেদনপত্রের হাতের লেখার সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষায় পূরণ করা চেকলিস্টের হাতের লেখায় অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে আরও যাচাই করে কয়েকটি অসংগতি শনাক্ত হলে কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়ার কয়েকটি ধাপে তারা নিজেরা অংশ নেননি। তাদের পরিবর্তে প্রক্সি পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, অর্থের বিনিময়ে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করত একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

প্রক্সি পরীক্ষার্থী ব্যবহারের আরেকটি ঘটনা ঘটে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। গত ১৯ জুলাই অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পাওয়ার পর যোগদান করতে এসে চারজন আটক হন। মৌখিক পরীক্ষার সময় ধারণ করা ছবির সঙ্গে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিদের চেহারার মিল না থাকায় বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রক্সি পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন জানান, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তারা যথাক্রমে ১৮ লাখ ও ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন। এর আগে একই নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে গত ৬ জুলাই জালিয়াতির অভিযোগে আরও ছয়জন গ্রেপ্তার হন।

জালিয়াতির ক্ষেত্রে শুধু প্রক্সি পরীক্ষার্থী ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই প্রতারণার কৌশল। প্রযুক্তির অপব্যবহার করেও পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা হচ্ছে। গত ৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ পরীক্ষায় নিষিদ্ধ উচ্চপ্রযুক্তির ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগে ১২ পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়। এর আগে গত ১০ জানুয়ারি জেলাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগে একই দিনে অর্ধশতাধিক পরীক্ষার্থী আটক হন। গত ১৯ জুন খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে নিয়োগ পরীক্ষায়ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগে ৫০ জনের বেশি পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়।

এ ছাড়া গত ২ মে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সমন্বিত নাবিক ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষা এবং অবৈধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সময় নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্প্রতি রংপুরে বাংলাদেশ পুলিশের ক্যাডেট এএসআই পদে নিয়োগের নামে জাল প্রবেশপত্র ও ভুয়া পরীক্ষার্থী সরবরাহকারী চক্রের মূল হোতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষাতেও সাম্প্রতিক সময়ে জালিয়াতির একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির ক্রমবর্ধমান ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার পদ্ধতিতেও নতুনত্ব এসেছে। পরীক্ষার্থীদের কেউ কেউ কানের ভেতরে ক্ষুদ্র ডিভাইস ব্যবহার করছেন। আবার মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষার সময় বাইরে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে শুধু প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়, পুরো নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণ ও তদারকি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি উইং-প্রশাসন) রাহেদ হোসেন বলেন, সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা আগে থেকেই ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে এ ধরনের অনিয়মের প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে জালিয়াতির কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে আটক করলেই নিয়োগ পরীক্ষার জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকা সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের অর্থের উৎস, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং নেপথ্যে থাকা সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা জোরদার, পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানো, বায়োমেট্রিক যাচাই বাধ্যতামূলক করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি জালিয়াতির মূল হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। অন্যথায় মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ, প্রতারণা ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি চাকরি পাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। এতে শুধু যোগ্য প্রার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও সংকটে পড়বে।

Maz
আরও পড়ুন