যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়। দূর থেকে তাকালে চোখে পড়ে লাল-ধূসর রঙের দৃষ্টিনন্দন চারতলা ভবন। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি দেখে সহজেই মনে হতে পারে, এখানে শিক্ষার মান পরিবেশও অত্যন্ত ভালো। কিন্তু ভবনের ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। শ্রেণিকক্ষ আছে, শিক্ষক আছেন, সরকারি বেতন-ভাতাও আছে—শুধু নেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী, নেই কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার ফল।
মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০ জনেরও কম। অথচ পাঠদানের দায়িত্বে রয়েছেন সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়া নয়জন শিক্ষক। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, সদ্য অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় এ বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়েছিল মাত্র একজন পরীক্ষার্থী। শেষ পর্যন্ত সেই একজনও পাস করতে পারেনি।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য এর দায় পুরোপুরি নিজেদের কাঁধে নিতে নারাজ। প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমানের ভাষ্য, আশপাশে আরও দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হতে চায় না। যারা ভর্তি হয়, তারাও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। ফলে এসএসসি পরীক্ষার ফলও খারাপ হচ্ছে।
কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষকদের উদাসীনতা, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্বশীলতার অভাবই ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টিকে শিক্ষার্থীশূন্যতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অভিভাবক সামিউর আলমের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁর দাবি, অতীতে বিদ্যালয়ে পড়াশোনার চেয়ে স্থানীয় রাজনীতির চর্চাই বেশি ছিল। অনেক শিক্ষক ও কর্মচারী স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সভা-সমাবেশ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ে।
এবার এই বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল তিনজন। ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, তিনজনের কেউই উত্তীর্ণ হয়নি।
প্রধান শিক্ষক সুজিত বালা জানান, পরীক্ষার্থীদের একজন নিয়মিত ও দুজন অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। বিদ্যালয়ের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষে পানি জমে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানে সমস্যা হয়। তাঁর দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের এ বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী নন।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সভাপতি পাভেল চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে এসেছে এই সংকটের গভীরতা। তাঁর মতে, বছরের পর বছর একটি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানোর পরও যদি কোনো শিক্ষার্থী পাস না করে, তাহলে শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তবে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন ও কার্যকর জবাবদিহিতা।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক দুর্বলতা কিংবা শিক্ষকদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি এবার গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে।
চুয়েটের পুকুরে ডুবে ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
শিক্ষক নিয়োগে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতার কারণ কি?
বুধবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি