শুরুতে চকচকে, ভেতরে খসখসে। বাইরে মানসম্মত বইয়ের চেহারা, কিন্তু কয়েক পাতা উল্টালেই বেরিয়ে আসছে নিম্নমানের কাগজের কারসাজি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে গিয়ে এমনই অভিনব কৌশলের অভিযোগ উঠেছে একাধিক ছাপাখানার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর কথা যে বইয়ের, তার প্রথম ১০ পাতায় ব্যবহার করা হচ্ছে তুলনামূলক ভালো মানের কাগজ। এরপরের প্রায় ১০০ পৃষ্ঠায় চলে যাচ্ছে নিম্নমানের কাগজ। অর্থাৎ বই দেখে যেন শুরুতেই মান নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে, সেই কৌশলেই ভেতরের পাতায় মান কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এমন অনিয়মের প্রমাণ সম্প্রতি একাধিক ছাপাখানায় পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মিনিস্ট্রি টিম’, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পরিদর্শন দল এবং দুই ইন্সপেকশন এজেন্ট। গত এক সপ্তাহেই ৫৫টি ছাপাখানায় ছাপানো প্রায় ৩ কোটি নিম্নমানের ফর্মা কেটে বিনষ্ট করা হয়েছে। এর আগে ৫২টি ছাপাখানার আরও ১ কোটি ফর্মা নষ্ট করা হয়। সব মিলিয়ে নিম্নমানের প্রায় ৪ কোটি ফর্মা ধ্বংস করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একই সঙ্গে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে ১৫টি ছাপাখানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এনসিটিবি।
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এনসিটিবির বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের প্রতি ফর্মা ছাপাতে খরচ পড়ে আনুমানিক ২ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু ১৩৩টি ছাপাখানা প্রতি ফর্মা ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৫৭ পয়সা দরে কাজ পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্রায় ১ হাজার কোটি ফর্মার বই মানসম্মতভাবে ছাপানো হলে ছাপাখানাগুলোর মোট আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। জনবল, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ সর্বোচ্চ ৪০০ কোটি টাকা ধরলেও নিট মুনাফার পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা হতে পারে—এমন হিসাব সংশ্লিষ্টদের।
তারপরও অভিযোগ উঠছে, নির্ধারিত মানের কাগজ ও কালি ব্যবহার না করে খরচ আরও কমানোর চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ সরকারি অর্থে দেওয়া একটি কাজ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা করার জন্য শিক্ষার্থীদের বইয়ের মানকেই ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানোর জন্য এনসিটিবির টেন্ডারেও কাগজ, মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের নির্দিষ্ট শর্ত রাখা হয়েছে।
এবারের অনিয়মের ধরনটিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করা হলে বইয়ের পুরো অংশ পরীক্ষা করে তা সহজেই ধরা পড়ত। কিন্তু এবার বইয়ের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠায় নির্ধারিত মানের কাগজ ব্যবহার করে পরে কাগজের মান কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন, বইয়ের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠায় কাগজের জিএসএম—অর্থাৎ প্রতি বর্গমিটারে কাগজের ওজন—সঠিক পাওয়া গেলেও পরের পৃষ্ঠাগুলোতে জিএসএম কম পাওয়া গেছে।
এনসিটিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বইয়ের মান নিশ্চিত করতে এবার নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সঠিকভাবে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব মনিটরিং কমিটির।
এরই মধ্যে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগে মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকেও এনসিটিবি শোকজ করেছে।
গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে শোকজ পাওয়া ছাপাখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে—মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, আনন্দ প্রিন্টার্স লিমিটেড, রেদওয়ানী প্রেস, লেটার অ্যান্ড কালার, লিখন আর্ট প্রেস, সাগরিকা, ফরায়েজি প্রেস, দোয়েল, অ্যারিস্ট্রোক্রাটস সিকিউরিটি অ্যান্ড প্যাকেজিং, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস, মেসার্স মুত্তাহিদা প্রিন্টার্স, শৈলী প্রেস, ভাই ভাই প্রিন্টিং প্রেস ও রাব্বিল প্রিন্টার।
এর মধ্যে আনন্দ প্রেস, সরকার প্রেস, রেদওয়ানী প্রেস ও টাঙ্গাইল অফসেট প্রেসকে দুই দফা করে শোকজ নোটিশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছাপাখানাগুলোর অনুমোদিত কাগজের নমুনা গোপনে সংগ্রহ করে বিজ্ঞানাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় অনুমোদিত কাগজের নমুনায় নিম্নমানের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কিন্তু সমস্যাটি দেখা দিয়েছে উৎপাদন পর্যায়ে। অনুমোদিত কাগজের পরিবর্তে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানোর ঘটনা সরেজমিন পরিদর্শনে ধরা পড়েছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—নমুনা পরীক্ষায় যদি অনিয়ম ধরা না পড়ে, তাহলে উৎপাদন পর্যায়ে কাগজ পরিবর্তনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে? মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ও এনসিটিবির নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু জানান, পাঠ্যবইয়ে ব্যবহূত প্রথম কয়েক পৃষ্ঠায় জিএসএম (কাগজের ওজন) সঠিক পাওয়া যাচ্ছে। পরের পৃষ্ঠাগুলোতে জিএসএম কম পাওয়া ঘটনা ধরা পড়েছে। এনসিটিবির আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সঠিকভাবে পিডিআই (প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন) করা হচ্ছে কি না, দেখার দায়িত্ব এনসিটিবির মনিটরিং কমিটির। পাঠ্যবইয়ের মান ঠিক রাখতে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এনসিটিবি।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, ‘বিসমিল্লাহ পেপার হাউজ’ থেকে গোপনে ছাপাখানাগুলোতে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মিন্টু মোল্লা, যিনি ‘কালা মিন্টু’ নামে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর একাধিক গোপন ছাপাখানা থাকারও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব গোপন ছাপাখানা থেকে ২০টির বেশি প্রেস নিম্নমানের বই ছাপায়। একই সঙ্গে এনসিটিবির পাঠ্যবই ছাপার কাজ পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গেও মিন্টু মোল্লার নাম জড়িয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন এবং অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য এই দুটি প্রেস ১০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি ওই দুই প্রেসে সরেজমিন পরিদর্শনে নিম্নমানের কাগজ ও কালি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে ‘মিনিস্ট্রি টিম’ ও এনসিটিবির ইন্সপেকশন এজেন্ট। পরে সংশ্লিষ্ট বই ও নিম্নমানের কালি নষ্ট করা হয়েছে।
সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে মিন্টু মোল্লার বিরুদ্ধে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে এনসিটিবিতে ডেকে সতর্ক করেন শিক্ষামন্ত্রী। এরপরও নিম্নমানের বই ছাপার অভিযোগ ওঠায় গত সপ্তাহে তাঁকে শোকজ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মিন্টু মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
মাতুয়াইলের পাঁচটি ছাপাখানার মালিকের বক্তব্যেও উঠে এসেছে কাগজ সরবরাহের দামের বড় ব্যবধানের কথা।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘কালা মিন্টু’ নামে পরিচিত ব্যক্তির সরবরাহ করা নিম্নমানের কাগজের বাজারদর প্রতি টন প্রায় ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু ছাপাখানার মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া হয় প্রায় ১ লাখ টাকা। বিপরীতে পাঠ্যবইয়ের জন্য নির্ধারিত মানের কাগজের প্রতি টনের দাম প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
দুটি ছাপাখানার মালিকের অভিযোগ, অনেক প্রেসকে ‘বিসমিল্লাহ পেপার হাউজ’ থেকেই কাগজ কিনতে বাধ্য করা হয়।
এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি বইয়ের কাগজ সরবরাহে একটি নির্দিষ্ট চক্রের প্রভাব এবং বাজার প্রতিযোগিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৮ কোটি ১৯ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫১ কপি। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গতকাল পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার ২৯১ কপি—অর্থাৎ মোটের ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।
মাধ্যমিক স্তরে ২২ কোটির বেশি বই ছাপানোর কাজ গত এক মাস ধরে পুরোদমে শুরু হলেও সরবরাহের অগ্রগতি মাত্র ২ দশমিক ৫২ শতাংশ বলে জানা গেছে।
এদিকে এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পরিমার্জিত পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে তারা কাজ করছে এবং ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলাপর্যায়ে বই সরবরাহ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিনামূল্যের পাঠ্যবই কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়। এটি রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক উপকরণ। ফলে নির্ধারিত মানের কাগজের পরিবর্তে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, বইয়ের এক অংশে ভালো কাগজ এবং অন্য অংশে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগ শুধু মুদ্রণ অনিয়ম নয়—এটি সরকারি অর্থের ব্যবহার, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার—তিন ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তৈরি করে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এনসিটিবির নির্ধারিত মানের কাগজের নমুনা পরীক্ষায় যদি কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে ছাপাখানায় পৌঁছে সেই কাগজ কীভাবে বদলে যাচ্ছে? পরিদর্শন প্রতিষ্ঠানগুলো কী দেখছে? পিডিআই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আর কয়েক কোটি ফর্মা নষ্ট করার পরও যদি একই কৌশল নতুন করে ধরা পড়ে, তাহলে নজরদারির কোথায় ঘাটতি রয়েছে?
অন্যদিকে ছাপাখানাগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য হলে, শুধু নিম্নমানের বই কেটে ফেলা বা শোকজ করাই যথেষ্ট কি না—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারণ একটি নিম্নমানের বই নষ্ট করে নতুন বই ছাপানো মানে শুধু কাগজ নষ্ট হওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সরকারি অর্থ, সময়, উৎপাদন সক্ষমতা এবং কোটি কোটি শিক্ষার্থীর নতুন শিক্ষাবর্ষ।
চকচকে প্রথম ১০ পাতা দিয়ে বইয়ের মান ঢেকে রাখা যায়। কিন্তু ভেতরের খসখসে পাতার দায় এড়ানো কঠিন।
কঙ্গোতে সামরিক বিমান বিধ্বস্ত, দুই জেনারেলসহ নিহত ১৪
ইরানের উপর মার্কিন চাপ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান ইরাকি নেতার
রিয়াদমুখী দুই হুথি ড্রোন ভূপাতিত, দাবি সৌদি জোটের
দুই পরাশক্তির মাঝখানে ইরাক, ইরানের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ
বিনিয়োগকারীদের সব ধরণের সুরক্ষা দেবে বাংলাদেশ