ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু ১০ জানুয়ারি, কক্সবাজার সৈকতে ওপেন স্ক্রিনিং

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম

আগামী ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চতুর্বিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬। রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এবারের উৎসবের স্লোগান ‘নান্দনিক চলচ্চিত্র, মননশীল দর্শক, আলোকিত সমাজ’।

বরাবরের মতো এবারের উৎসবে এশিয়ান ফিল্ম কম্পিটিশন, রেট্রোস্পেকটিভ, ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, বাংলাদেশ প্যানোরামা, সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড, চিলন্ড্রেন ফিল্ম সেশন, ওমেন ফিল্মমেকার বিভাগ, শর্ট অ্যান্ড ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম, স্পিরিচুয়াল ফিল্ম, ওপেন টি বায়োস্কোপ বিভাগে বাংলাদেশসহ ৯১টি দেশের ২৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে।

এবারই প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে অনুষ্ঠিত হবে ওপেন এয়ার স্ক্রিনিং। বাংলাদেশ টুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ছবিগুলো লাবণী বিচ পয়েন্টে দেখানো হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই প্রদর্শনীটিও থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন আয়োজকরা স্বাগত বক্তব্য দেন উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর অনেক কিছু করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করি। কিন্তু অনেক কিছু করা হয়ে ওঠে না বাজেটসহ নানান কারণে।’ আক্ষেপ করে আজও তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটের জন্য টাকা আছে, ব্যান্ড মিউজিকের জন্য টাকা আছে, শুধু ফিল্মের জন্য দেওয়ার মতো টাকা নেই কারো কাছে।’ তিনি উৎসবের বিস্তারিত তুলে ধরে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রফিকুজ্জামানের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী নুজহাত ইয়াসমিন, ঢাকা ক্লাবের পরিচালক মো. এহসানুল হক দিপু, এনিগমা মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ফাহমিদুল ইসলাম শান্তনু, ফিলিপাইনের চলচ্চিত্রকার এডিথ জেড ক্যাডুয়ায়া, চলচ্চিত্র সমালোচক সাদিয়া খালিদ ঋতি, বিধান রিবেরু, চারুশিল্পী লুতফা মাহমুদা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১০ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মূল মিলনায়তনে পর্দা উঠবে চতুর্বিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ক্রোয়েশিয়ান যুক্তরাজ্য ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা আলেকজান্দ্রা মারকোভিচ এবং বাংলাদেশে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলর লি শিওপেং। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও উৎসব কমিটির নির্বাহী সদস্য জনাব জালাল আহমেদ।

উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে এদিন দেখানো হবে চীনা পরিচালক চেন শিয়াং পরিচালিত ‘উ জিন ঝি লু’ (দি জার্নি টু নো এন্ড)। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে ‘থিয়েটিক্যাল কোম্পানি ও জল তরঙ্গ’ গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে।

উৎসবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর স্থানসমূহ- জাতীয় জাদুঘরের মূল মিলনায়তন ও কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তন, শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা ও নাট্যশালার মূল মিলনায়তন, অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তন ও স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের মিলনায়তন। এসব মিলনায়তনের সব প্রদর্শনী সবাই বিনামূল্যে উপভোগ করতে পারবেন। আসন সংখ্যা সীমিত থাকায় ‘আগে এলে আগে দেখবেন’ ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হবে।

১১ থেকে ১২ জানুয়ারি উৎসবের অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা বিষয়ক ‘টুয়েলফথ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন উইমেন ইন সিনেমা ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা ক্লাবের স্যামসাং লাউঞ্জের তৃতীয় তলায় অনুষ্ঠিত হবে। এই কনফারেন্সে দেশি বিদেশি নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ব্যক্তিত্বদের সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী নির্মাতাগণ অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ পাবেন। এখানে নারী নির্মাতারা তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাসমূহ এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে বিশ্বের খ্যাতিমান নারী নির্মাতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বিশ্ব পরিবর্তনে নারীর নেতিবাচক ও ইতিবাচক ভূমিকা এবং প্রতিবন্ধকতা থেকে সমাধানের উপায়সমূহ উঠে আসবে এই কনফারেন্সে। প্রধান অতিথি হিসেবে ১১ জানুয়ারি কনফারেন্সটি উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর তানিয়া হক। অধ্যাপক কিশোয়ার কামালের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানটি শুরু হবে সকাল সাড়ে ৯টায়, একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। 

উৎসবে এবারও ১১-১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ওয়েস্ট মিটস ইস্ট স্ক্রিনপ্লে ল্যাব। এ বছর থেকে এই ল্যাব শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়ার নয়, সমগ্র এশিয়া মহাদেশের নির্মাতাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এটি উদীয়মান এশিয়ান নির্মাতাদের জন্য একটি বড় সুযোগ, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত হতে এবং বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে নিজেদের কাজ তুলে ধরতে পারবেন। জমা দেওয়া প্রস্তাবগুলোর মধ্যে থেকে শীর্ষ ১০টি প্রকল্প নির্বাচিত করা হয়েছে, যেগুলো চার দিনের মেন্টরশিপ ওয়ার্কশপে অংশ নেবে। প্রথম তিন দিন অংশগ্রহণকারীরা ব্যক্তিগতভাবে একজন করে মেন্টরের সঙ্গে কাজ করবেন, আর চতুর্থ দিনে তারা নিজেদের প্রজেক্টগুলো ফিল্মহাট মার্কেটপ্লেসে নির্মাতা, প্রযোজক, পরিবেশক ও ওটিটি প্রতিনিধিদের সামনে পিচ করবেন। স্ক্রিনপ্লে ল্যাব অনুষ্ঠিত হবে ধানমণ্ডিস্থ ভিনটেজ কনভেনশন হলে। এই ল্যাবে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য পাবে নগদ ৫ লাখ টাকা, দ্বিতীয় স্থান অধিকারকারী চিত্রনাট্য পাবে ৩ লাখ টাকা এবং তৃতীয় স্থান জয়ী চিত্রনাট্য পাবে ২ লাখ টাকা।

চতুর্থবারের মতো এবারও থাকছে মাস্টারক্লাস। এর আগে মাজিদ মাজিদি, অঞ্জন দত্ত, ড. শি চুয়ান এবং রাশেদ জামানের মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। ২০২৬ সালের মাস্টারক্লাস অনুষ্ঠিত হবে ১৭ জানুয়ারি। দিনব্যাপী এই আয়োজনে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কথা বলবেন সুইস ফিল্ম ম্যাগাজিন সিনেবুলেটিনের এডিটর ইন চিফ টেরেসা ভিনা, ক্রোয়েশিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বক্তা আলেকজান্দ্রা মারকোভিচ এবং বাংলাদেশের নির্মাতা ও প্রোডাকশন ডিজাইনার লিটন কর।

এবারও থাকছে আর্ট এক্সিবিশন যা শুরু হবে ৯ জানুয়ারি, শেষ হবে ১৭ জানুয়ারি। এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়ামের থ্রিডি আর্ট গ্যালারিতে। এই বিশেষ আয়োজনে বাংলাদেশের ১০ জন স্বীকৃত ও খ্যাতনামা শিল্পীর নির্বাচিত শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে। চলচ্চিত্র ও চারুকলার সমন্বয়ে এই এক্সিবিশন শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল অভিব্যক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপিত হবে। এক্সিবিশন কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শিল্পী লুতফা মাহমুদা।

১৮ জানুয়ারি পর্দা নামবে চতুর্বিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। সমাপনী দিনে বিকাল চারটায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মূল মিলনায়তনে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও উৎসব কমিটির নির্বাহী সদস্য জনাব জালাল আহমেদ। অনুষ্ঠান শেষে দেখানো হবে এবারের উৎসবে সেরা পুরস্কার জিতে নেওয়া চলচ্চিত্রটি। সমাপনী অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন আহমেদ হাসান সানি।

আয়োজকদের প্রত্যাশা- চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র সমালোচক, বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস সমূহের কর্মকর্তা, রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদসহ অন্যান্য চলচ্চিত্র সংসদ এবং বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের অংশগ্রহণে এবারের উৎসব আরো বেশি প্রাণবন্ত ও সাফল্য মণ্ডিত হবে। 

প্রতিবারের মতো এবারও সহযোগিতায় রয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস, অ্যাকশন এইড ও এসএমসি। উৎসব পার্টনার হিসেবে আছে- বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, ঢাকা ক্লাব লিমিডেট, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, থ্রিডি আর্ট গ্যালারি, ভিনটেজ কনভেনশন হল, নরওয়েজিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হগুসন্ড, রিলিজিওন টুডে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, চ্যানেল আই, ওটিটি প্লাটফর্ম দোয়েল, সেন্স ফর ওয়েভ ও ক্লাউডলাইভ। 

NB/FJ
আরও পড়ুন