কেমন করে এলো রক্তে কেনা অধিকার: মহান মে দিবস 

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৩:৫৬ এএম

প্রতি বছর ১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। আধুনিক সভ্যতার চাকাকে সচল রাখতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের নাম ‘মে দিবস’। 

তবে এই দিনটি কেবল একদিনের কোনো বিক্ষোভ নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে চলা শোষণ আর আত্মত্যাগের ইতিহাস।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও শ্রমিকদের জীবন ছিল অনেকটা দাসের মতো। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো শ্রমিকদের। 

১৮৩৭ সালে মার্কিন সরকার সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১০ ঘণ্টা কর্মদিবস নির্ধারণ করলেও বেসরকারি শিল্পমালিকরা ছিল লাগামহীন। এই অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রথম সুর চড়ান আধুনিক সমাজতন্ত্রের জনক কার্ল মার্কস। 

১৮৬৪ সালে লন্ডনে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবি তোলেন। পরে ১৮৬৬ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘৮ ঘণ্টা কর্মদিবস’-এর প্রস্তাব গ্রহণ করে।

১৮৮৬ সালের ১লা মে ছিল শনিবার। আমেরিকার শিল্পনগরী শিকাগোসহ বিভিন্ন শহরে প্রায় ৩ লক্ষ ৪০ হাজার শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন। 

শান্তিপূর্ণ এই ধর্মঘট ৩ মে পর্যন্ত আরও শক্তিশালী হয়। কিন্তু মালিকপক্ষ ও পুলিশের চক্রান্তে আন্দোলন দমনে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। ৩ মে পুলিশের গুলিতে ৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।

এর প্রতিবাদে ৪ মে শিকাগোর ‘হে মার্কেট’ স্কয়ারে বিশাল এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের শেষ মুহূর্তে অজ্ঞাত কোনো হামলাকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছুড়লে শুরু হয় পুলিশের বেপরোয়া গুলিবর্ষণ। মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় হে মার্কেট। সেখানে ৪ জন শ্রমিক নিহত হন এবং ৭ জন পুলিশ সদস্য মারা যান।

আন্দোলন স্তব্ধ করতে রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ মরিয়া হয়ে ওঠে। তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো শ্রমিকদের ‘কমিউনিস্ট’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে তাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবি জানায়। 

বিচারের নামে এক প্রহসন আয়োজন করে ৪ জন শ্রমিক নেতাকে—ফিশার, এঞ্জেল, স্পাইজ ও পার্সনস—মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নির্ভীকচিত্তে তারা ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ উৎসর্গ করেন, কিন্তু তাদের সেই ত্যাগ বৃথা যায়নি।

১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শিকাগোর বীরদের স্মরণে এবং শ্রমিক সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যে ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। 

১৮৯১ সালে ফ্রান্সেও এই দিবস পালনকালে পুলিশের গুলিতে ৫০ জনের বেশি শ্রমিক শহীদ হন। তবুও দমানো যায়নি শ্রমিকের অধিকারের দাবি। শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ নতি স্বীকার করে এবং বিশ্বব্যাপী ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আইনগত স্বীকৃতি পায়।

আজকের দিনে আমরা যে কর্মঘণ্টা বা শ্রম অধিকারের কথা বলি, তা মূলত হে মার্কেটের সেই রাজপথ ভেজানো রক্ত আর শ্রমিক নেতাদের জীবনের বিনিময়ে কেনা। 

মে দিবস কেবল একটি ছুটির দিন নয়; এটি মেহনতি মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতীক। যার মূলমন্ত্র আজও ধ্বনিত হয়—‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও!’

HN
আরও পড়ুন