যন্ত্রের কোলাহলে ডুবে থাকে আর্তনাদ

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ১০:৩১ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যারা, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নাম যাদের ঘামে উজ্জ্বল, সেই শ্রমিকদের অনেকে আজও অধিকার থেকে বঞ্চিত, নিপীড়নের শিকার। রাজধানীর অদূরে গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোয় যেখানে দিন-রাত চলে সেলাই মেশিনের কোলাহল, সেখানে যেন নীরবেই ফেটে পড়ছে অসংখ্য ক্ষোভ।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা রাইটস ল্যাব ও গুডওয়েভ ইন্টারন্যাশনালের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের উপ-খাতগুলোর প্রায় ৩২ শতাংশ শ্রমিক এখনো ন্যূনতম মজুরির কম পান। আরও দুঃখজনক তথ্য হলো, জরিপে অংশ নেওয়া প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের ৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন।

চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এই নাজুক অবস্থা আরও ঘনীভূত করছে। রপ্তানি সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে সাব-কন্ট্রাক্টিং (ঠিকা কাজ) ও বাসাবাড়িভিত্তিক কাজের মাধ্যমে পোশাক খাতের কর্মসংস্থানের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে। জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএনএসকাপ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৯২ শতাংশ শ্রমিকের চাকরির কোনো লিখিত চুক্তি নেই। ইউএনএসকাপের ৫৩টি সদস্য ও ৯টি সহযোগী সদস্য দেশের ওপর পরিচালিত জরিপের ওই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ ও বিভাজনের বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো দেশে সুদূরপ্রসারী আর্থ-সামাজিক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি চাহিদা কমে গেলে অনানুষ্ঠানিক ও সাব-কন্ট্রাক্টে থাকা শ্রমিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিতে পড়বেন। কারণ, এ ধরনের কাজে কোনো নোটিশ পিরিয়ড বা চাকরির নিরাপত্তা থাকে না, ফলে শ্রমিকরা সামাজিক সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত হন। ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে তারাই প্রথম শিকার হন এবং পুনরায় নিয়োগে অগ্রাধিকার পান না।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সভ্যতার ভিত গড়েন যে শ্রমজীবী মানুষ, আজ তাঁদের অধিকার আদায়ের দিন।

শুধু নিরাপত্তাহীনতা নয়, ক্ষুণ্ণ হচ্ছে শ্রমিকদের মানবিক মর্যাদাও। নির্যাতনের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। জরিপে অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর ৫৬ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, তাদের বর্তমান কর্মক্ষেত্রে তারা হুমকি বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও নাবালক শ্রমিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়—নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা সপ্তাহে ৫৬ ঘণ্টা (দৈনিক গড়ে ৯.৩ ঘণ্টা) হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একই জরিপে দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিককে দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশি শ্রম আইন উভয়েরই লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা। শুধু কারখানার ভেতরেই নয়, বাইরেও শ্রমিকদের পথ বন্ধ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বাংলাদেশে এখনো শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনে বাধা রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের প্রক্রিয়া জটিল, যা শ্রমিকদের ন্যায্য দরকষাকষির ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। অনেক কারখানায় যৌথ দরকষাকষি কমিটি (পিসি) গঠন করা সম্ভব হয়নি। সময়মতো বেতন না দেওয়া, ওভারটাইমের যথাযথ মূল্য না দেওয়া এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। শ্রম আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা ও মালিকপক্ষের প্রভাব ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি মাসিক ১২ হাজার ৫০০ টাকা। চা-শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৭২ টাকা, নির্মাণ শ্রমিকের দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা (কোনো স্থায়িত্ব নেই), কৃষি খাতে আয় মৌসুমি ও অনিয়মিত, আর চামড়া ও ট্যানারি খাতে কর্মপরিবেশ অস্বাস্থ্যকর ও মজুরি কম।

প্রচণ্ড রোদে পুড়ে আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশাল সব কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করেন আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা।

শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, এই মজুরিতে একটি পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। ঢাকায় খাদ্য, যাতায়াত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খরচ মিলিয়ে ন্যূনতম একটি পরিবার চালাতে মাসিক ব্যয় গড়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার বেশি। শুধু ঘর ভাড়াই ৫-১০ হাজার টাকা। ফলে বেশিরভাগ শ্রমিক দেনায় জর্জরিত, পুষ্টিকর খাবার ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। পোশাক খাত ছাড়া অন্য খাতে অনেকের জন্য ন্যূনতম মজুরির নির্দিষ্ট কাঠামোও নেই।

সাভারের একটি পোশাক কারখানার কর্মী জোসনা বলেন, ‘১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু এখন এই টাকায় চলে না। বাচ্চার স্কুল, বাজার, ভাড়া— সবকিছু বাড়ছে, শুধু মজুরি বাড়ে না।’ অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, ওভারটাইমের সঠিক মজুরি পাওয়া যায় না, মাসের বেতন আটকে রাখা হয়। পর্যাপ্ত ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বা কর্মস্থলে নিরাপত্তা— এসব অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল। নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্র ও সংসারের দ্বৈত বোঝা সামলালেও হয়রানি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হন। সরকারি চাকরিজীবীরা ছয় মাস স্ববেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি পান; কিন্তু গার্মেন্টসসহ অন্য শিল্প-কারখানায় তা নেই। একই দেশে দুই নিয়ম সম্পূর্ণ অন্যায্য বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক অধিকার কর্মীরা।

শ্রমিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ড. লিপন মণ্ডল তার সাম্প্রতিক গবেষণায় বলেছেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এক বিশেষ ধরনের ‘সামাজিক স্বৈরতন্ত্র’ কায়েম হয়েছে। এই শাসনকাঠামোয় আইনি ও বেআইনি উভয় ধরনের শক্তি প্রয়োগ করা হয়। কারখানার ভেতরে ও বাইরে— উভয় জায়গাতে শ্রমিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। রাষ্ট্র ও পরিবারের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বহুজাতিক কোম্পানি ও শিল্পমালিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখে। ‘স্ট্রাকচারাল ও ইন্সট্রুমেন্টাল’— এ দুই ধরনের নিপীড়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের ‘বাধ্যতামূলক সম্মতি’ আদায় করা হচ্ছে।

রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনরাত এক করে উন্নত অবকাঠামো গড়ে তুলছেন এই কারিগরেরা।

বাংলাদেশে ‘শ্রম আইন, ২০০৬’ ও সংশোধিত ‘২০১৮’ থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ শ্রমিকই তাদের অধিকার জানেন না। শ্রম অধিদপ্তরের তদারকি সীমিত, মালিকপক্ষ প্রভাবশালী। সরকার শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করলেও অধিকার বাস্তবায়ন দুর্বল। বেসরকারি খাতে কিছু কারখানায় ‘লিভিং ওয়েজ’ ও শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ তৈরি হলেও তা সামগ্রিক খাতে পৌঁছেনি।

এ পরিস্থিতির সমাধানের পথ ও প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বছরে অন্তত একবার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি সমন্বয়, সব খাতে স্বাস্থ্য বীমা, অবসরভাতা ও মাতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক, সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত, মালিক-শ্রমিক সংলাপ বৃদ্ধি এবং কাজের পরিবেশ নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও মানবিক করা।

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা আমাদের নারী শ্রমিকদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় বিশ্বজুড়ে সমাদৃত `মেড ইন বাংলাদেশ`।

বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ, ট্রেড ইউনিয়ন স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। কেবল দিবস উদযাপন নয়, বাস্তবিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকার ও মালিকপক্ষকে এগোতে হবে। শ্রমিকদের জন্য আবাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে জোরালো নজরদারি ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা জরুরি।

আজ পহেলা মে, দিনটি শুধু র‌্যালি আর মিটিংয়ের নয়। এই দিনটি সরকার, মালিকপক্ষ ও সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে ভাবিয়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু এই উন্নয়নের ফসল যদি হয় ক্ষুধার্ত ও নির্যাতিত শ্রমিক, তবে সেই উন্নয়ন কতটুকু টেকসই? শ্রমিকরা যেন মুখ বুজে কাজ করে যান, আর সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন মালিক, ক্রেতা ও দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো— এটি কোনো ন্যায়ের দাবি হতে পারে না। ন্যূনতম মজুরি আইনানুগভাবে প্রয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা হোক। এ প্রত্যাশাই পহেলা মে’তে।

আরও পড়ুন