সরকারের ১০০ দিনে টিআইবির চোখে নাগরিক অধিকারের অসন্তোষজনক

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১০০ দিন পার হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে দেশের পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা দৃশ্যত বৃদ্ধি পেলেও, সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বরং এই পরিস্থিতিকে বেশ ‘উদ্বেগজনক’ বলেই মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। 

রোববার (৭ জুন) ধানমন্ডি মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এই মূল্যায়ন তুলে ধরে। সাংবাদিকতার আধুনিক ধারা অনুযায়ী, একটি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড দিয়ে তাকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা সম্ভব না হলেও, এই প্রাথমিক সময়ের পর্যবেক্ষণটি আগামী দিনের পথ তৈরিতে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

টিআইবির সংগৃহীত ও পর্যালোচিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সরকারের বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণ-এর মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। 

বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় সংগঠিত বিভিন্ন অপরাধের গভীরতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৪০ শতাংশেরই পেছনে রয়েছে কিশোরদের সংশ্লিষ্টতা। কিশোর গ্যাংয়ের এই অব্যাহত তৎপরতা সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের অপরাধগুলোর পেছনে এক ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রচ্ছন্ন মদদের অভিযোগও রয়ে গেছে, যা অপরাধ দমনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় ১০০ দিনের অপরাধের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসেই দেশজুড়ে অন্তত ৯০টি ডাকাতি, প্রায় তিনশটি ছিনতাই এবং ছয় শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরেও শত শত চুরির ঘটনা এবং প্রায় দুইশটি অপহরণের ঘটনা নাগরিক সমাজকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে এক শর বেশি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা। এই সময়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে, যেখানে সময়মতো হামের টিকার মতো মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে না পারায় অনেক শিশুই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিশেষ করে আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার সুরক্ষার দুর্বলতাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। 

মধুপুরে একটি রাবার বাগান কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শন করে একটি আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদ করার ঘটনা যেমন সামনে এসেছে, তেমনি গাইবান্ধায় আন্দোলনরত সাঁওতালদের ওপর হামলার ঘটনাও দেশের প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে প্রকাশ করে। এই হামলায় নারী নেত্রীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা, যেমন ই-হেলথ কার্ডের পাইলট প্রকল্পে দেশের প্রান্তিক ও আদিবাসী অঞ্চলের মানুষের চাহিদা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি দেশের শিক্ষা খাত, বিচার বিভাগ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত চোখে পড়েছে। সরকারের এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে দেশের প্রায় ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে শূন্য পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এক ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নজির তৈরি হয়েছে, যা উচ্চশিক্ষার পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এদিকে মুক্ত সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নেও বর্তমান সরকারের এই ১০০ দিনের চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। এই সময়ে প্রায় দুই শতাধিক সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং এক ডজনেরও বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশের পক্ষ থেকে সংবাদপত্রের কার্যালয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এর পাশাপাশি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দায়ের হওয়া বিভিন্ন হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকদের জামিন না করানোর বিষয়টিও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে সংকুচিত করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ বা সরকারের শীর্ষ মহলের সমালোচনা করার কারণে একাধিক ব্যক্তিকে আটক ও আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা নাগরিকের বাকস্বাধীনতার ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

টিআইবির গবেষক ও এক্সিকিউটিভ প্রধানের মতে, সরকারের এই শুরুটা যেমন কিছু নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি জননিরাপত্তা, মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এখনো অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে সরকার যদি এসব ঘাটতি দূর করে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি করতে পারে, তবেই এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

AHA
আরও পড়ুন