ইউনেস্কো পুরস্কার পেলো বাংলাদেশের ভাসমান বিদ্যালয়

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

বাংলাদেশের উদ্ভাবনী ও মানবিক শিক্ষা উদ্যোগ আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান অর্জন করেছে। দেশের বৃহত্তম জলাভূমি অঞ্চল চলনবিলে সৌরশক্তিচালিত ভাসমান বিদ্যালয়ের মাধ্যমে দুর্গম ও জলবেষ্টিত এলাকার শিশু-কিশোরদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ গ্রহণ করেছে। 

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিস্তার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণে সংস্থাটি এ মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছে।

ইউনেস্কো ঢাকা আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশনের (বিএনএফই) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেবব্রত চক্রবর্তী এবং ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ।

অনুষ্ঠানের সূচনা পর্বে ইউনেস্কো ঢাকার শিক্ষা বিভাগের প্রধান নোরিহিদে ফুরুকাওয়া ‘ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫’ এবং এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার প্রসার’ বিষয়ে একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা তুলে ধরেন। তিনি বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং পরিবর্তিত বাস্তবতায় সাক্ষরতার নতুন মাত্রা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আলোকপাত করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় শিক্ষা পৌঁছে দিতে উদ্ভাবনী উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ শুধু শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দক্ষ, সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সরকার এ ধরনের কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগকে উৎসাহিত ও সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ বছর ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারে বাংলাদেশের সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট লিটারেসি এজেন্সি (নালা) এবং মরক্কোর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সম্মানিত হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক মানুষ এবং বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণদের জন্য উদ্ভাবনী সাক্ষরতা কর্মসূচি বাস্তবায়নের স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান সুসান ভাইজ সাক্ষরতার রূপান্তরমূলক শক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সাক্ষরতা কেবল পড়তে ও লিখতে শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা দেয়, জীবনের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে সহায়তা করে এবং সমাজের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের পথ সুগম করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোর গুরুত্ব দিন দিন আরও বাড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার ভাসমান বিদ্যালয় প্রকল্পকে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যতিক্রমধর্মী ও সৃজনশীল শিক্ষা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে বসবাসকারী মানুষের জন্য শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এ উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। এলাকাটির দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ বর্ষা মৌসুমের কারণে স্থানীয় শিশুদের জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে নদী-খাল উপচে পড়ে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেলে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত ব্যাহত হয়।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা চালু করে নৌকাভিত্তিক ভাসমান বিদ্যালয় ব্যবস্থা। শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এসব নৌকা শিক্ষার্থীদের কাছে সরাসরি পৌঁছে যায় এবং তাদের জন্য শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। স্থানীয় নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত প্রতিটি নৌকায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অনন্য উদাহরণ।

বর্তমানে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা মোট ৫৬টি নৌকা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২৬টি নৌকা ভাসমান শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ১০টি নৌকা ভাসমান গ্রন্থাগার ও কম্পিউটার ল্যাব হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বই পড়ার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। আরও ৮টি নৌকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি নৌকাগুলো স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, খেলাধুলার কার্যক্রম পরিচালনা এবং পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষা নয়, বরং একটি সমন্বিত সামাজিক উন্নয়ন মডেল হিসেবেও কাজ করছে।

সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, স্থানীয় মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণকে ভিত্তি করেই টেকসই সমাধান গড়ে ওঠে। তার মতে, যে সমস্যার মুখোমুখি একটি সম্প্রদায় প্রতিদিন হয়, সেই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধানের ধারণাও প্রায়শই সেই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই আসে। 

তিনি বলেন, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা জোগাবে।

উল্লেখ্য, ইউনেস্কো ১৯৬৭ সাল থেকে সাক্ষরতা উন্নয়নে অসাধারণ অবদান ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার প্রদান করে আসছে। এরই অংশ হিসেবে চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এ পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। প্রতি বছর কার্যকর সাক্ষরতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ অঞ্চলের প্রাপ্তবয়স্ক ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণদের শিক্ষায় সহায়তা করার জন্য বিশ্বের তিনটি প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের জন্য এ অর্জন নতুন নয়। এর আগে ২০২৩ সালে ফ্রেন্ডশিপ এবং ২০১৩ সালে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ইউনেস্কোর এই মর্যাদাপূর্ণ কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার অর্জন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার এই সাফল্য বাংলাদেশের উদ্ভাবনী শিক্ষা উদ্যোগকে আবারও বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরল। চলনবিলের জলপথে ভেসে চলা এই বিদ্যালয়গুলো আজ শুধু শিক্ষার বাহন নয়, বরং প্রমাণ করে দিয়েছে যে সৃজনশীল চিন্তা, স্থানীয় জ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে সবচেয়ে দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছেও শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

AT/AHA
আরও পড়ুন