বিশ্বের মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতির এক অনন্য নাম পবিত্র কাবা ঘর। পবিত্র নগরী মক্কা ও কাবার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বহু নবী-রাসুল ও ইসলামের স্মৃতির অমূল্য দাগ। সৌদি আরবের মসজিদুল হারাম ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান, আর এই মসজিদের কেন্দ্রেই কাবার অবস্থান। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কখনো বন্ধ হয়নি কাবার তাওয়াফ। ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে আবর্তিত হচ্ছে এই পবিত্র গৃহের প্রদক্ষিণ। তবে ইচ্ছা করলেই যে কেউ কাবার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না—এই সুযোগ অত্যন্ত বিরল ও সৌভাগ্যের।
পবিত্র কাবাঘর সৌদি আরবের মক্কা মুকাররমার মসজিদুল হারামে অবস্থিত। এটি মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র ও সম্মানের স্থান এবং নামাজের কেবলা। কাবা শব্দের অর্থ উঁচু। আরবিতে উঁচু ঘরকে কাবা বলা হয়। এই ঘরটি যেহেতু উঁচু তাই এর নামকরণ করা হয়েছে কাবা।
কাবার বাইরের দৃশ্য সবার চেনা হলেও এর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও বিন্যাস নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। চলুন, একনজরে দেখে নেওয়া যাক কাবার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও নিদর্শন।

কাবার অভ্যন্তরীণ কাঠামো
পবিত্র কাবার দরজা বছরে মাত্র দুবার খোলা হয় বিশেষ ধৌতকরণ ও রাষ্ট্রীয় মেহমানদের জন্য। ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত আধ্যাত্মিক, শান্ত ও জাঁকজমকহীন আভিজাত্যে ঘেরা।

উচ্চতা: প্রায় ১২ থেকে ১৩ মিটার।
তিনটি স্তম্ভ: কাবার ছাদ ধারণের জন্য সারিবদ্ধভাবে তিনটি মজবুত কাঠের স্তম্ভ রয়েছে। এগুলো হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর সময় থেকে স্থাপিত এবং উন্নতমানের ‘টিক’ কাঠ দিয়ে নির্মিত। বর্তমানে স্তম্ভগুলো স্বর্ণখচিত নকশায় সুসজ্জিত।
মেঝে ও দেয়াল: মেঝে ও দেয়ালের নিচের অংশ সাদা ও ধূসর মার্বেল পাথরে আবৃত। দেয়ালের ওপরের অংশে সবুজ রেশমি কাপড় বা প্যানেল আছে, যেখানে পবিত্র কোরআনের আয়াত স্বর্ণখচিত ক্যালিগ্রাফিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

ছাদ: আদি অবস্থায় কাবার ছাদ ছিল না। কুরাইশদের সংস্কারের সময় প্রথম ছাদ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে কাঠামো মজবুত করতে আরও একটি বাড়তি ছাদ যুক্ত করা হয়।
কাবার ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন
কাবার ভেতরে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও বিশেষ বস্তু সংরক্ষিত আছে।
বাবুত তাওবা (তাওবার দরজা): কাবার ভেতরে ডান পাশে ছোট একটি সোনার দরজা, যা মূলত কাবার ছাদে ওঠার সিঁড়িঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ঐতিহাসিক প্রদীপমালা: স্তম্ভগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন যুগের প্রাচীন মশাল, পিদিম ও প্রদীপমালা ঝোলানো আছে। বিশ্বের প্রভাবশালী রাজা-বাদশাহরা এগুলো উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন।

নবীজির (সা.) নামাজের স্থান: কাবার ভেতরে একটি বিশেষ জায়গা চিহ্নিত আছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর প্রবেশ করে নামাজ আদায় করেছিলেন। উল্লেখ্য, কাবার ভেতরে যে কোনো দিকে মুখ করেই নামাজ পড়া যায়।

সুগন্ধির বাক্স: মার্বেল পাথরের তৈরি একটি টেবিল বা বাক্সের মতো স্থান, যেখানে উন্নতমানের উদ, কস্তুরি ও গোলাপজলের সুগন্ধি রাখা হয়।
স্মারক ফলক: ভেতরের দেয়ালে বিভিন্ন যুগের খলিফা ও বাদশাহদের নাম খোদাই করা মার্বেল ফলক রয়েছে, যারা কাবা সংস্কারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

কাবার দরজা ও গিলাফের মাহাত্ম্য
বর্তমান দরজাটি ১৯৭৭ সালে বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজের নির্দেশে তৈরি করা হয়। ১০ সেন্টিমিটার পুরুত্বের উন্নত কাঠে নির্মিত এই দরজায় প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, কাবার গায়ের কালো গিলাফ বা ‘কিসওয়া’ তৈরিতে প্রায় ৬৭০ কেজি রেশম ও ১৫ কেজি সোনার সুতা প্রয়োজন হয়, যার ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি।

পবিত্র কাবা ঘর পরিষ্কারে জমজমের পানি, খাঁটি গোলাপজল ও বিশেষ ‘উদ’ সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়। খেজুর পাতা ও কোমল সাদা কাপড় দিয়ে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গেই মেঝে ও দেয়াল পরিষ্কার করা হয়।
পবিত্র কাবার ভেতরে বাহ্যিক জৌলুশের চেয়েও বেশি বিরাজ করে সরলতা ও আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য। এটি এমন এক অনন্য স্থান, যেখানে গেলে মহান রবের শ্রেষ্ঠত্ব ও ইসলামের প্রাচীন ইতিহাসের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
জানেন কি কাবা গিলাফের রহস্য?
কাবা শরিফের গিলাফ কাটতে গিয়ে তুর্কি নারী আটক
কাবা চত্বরে প্রবেশে নতুন নিয়ম