কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, আল্লাহর পথে যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাতই শহীদের একমাত্র ধরন নয়। কিছু বিশেষ ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ে মৃত্যুবরণকারী মুমিনদের সম্পর্কেও রাসূলুল্লাহ (স.) শহীদের মর্যাদার সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে শহীদ হয়েছেন—এমন ঘোষণা দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই। এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধস, ভূমিধস কিংবা ভবন ধসে প্রতিবছর বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এমন দুর্ঘটনায় কোনো মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি কি শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন?
কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, শহীদ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাতবরণকারী ব্যক্তিই নন; আল্লাহ তাআলা তার অসীম অনুগ্রহে কিছু বিশেষ ধরনের বিপর্যয়, রোগ বা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী মুমিনদেরও শহীদের মর্যাদার সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে শহীদ—এমন ঘোষণা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।
হাদিসে শহীদের বিভিন্ন প্রকার
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الشُّهَدَاءُ خَمْسَةٌ: الْمَطْعُونُ، وَالْمَبْطُونُ، وَالْغَرِيقُ، وَصَاحِبُ الْهَدْمِ، وَالشَّهِيدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
‘শহীদ পাঁচ প্রকার—মহামারীতে মৃত্যুবরণকারী, পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী এবং আল্লাহর পথে শাহাদাতবরণকারী।’ (বুখারি ২৮২৯, মুসলিম ১৯১৪)
অন্য একটি হাদিসে হজরত জাবির ইবন আতিক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) শহীদের আরও কয়েকটি প্রকার উল্লেখ করেন, যেখানে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারীও অন্তর্ভুক্ত।’ (আবু দাউদ ৩১১১)
পাহাড় ধসে মৃত্যু কি ‘ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া’র অন্তর্ভুক্ত?
হাদিসে ব্যবহৃত "صَاحِبُ الْهَدْمِ" (সাহিবুল হাদম) শব্দটির অর্থ হলো—ধ্বংসস্তূপ বা ধসে পড়া স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইয়াহইয়া ইবন শরফ আন-নববি (রহ.) তার শারহ সহিহ মুসলিম-এ এভাবেই এর ব্যাখ্যা করেছেন।
এই ব্যাখ্যার আলোকে সমকালীন বহু আলেম মত দিয়েছেন যে, পাহাড় ধসে মাটি বা পাথরের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণও এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করা যায়। অতএব, কোনো ঈমানদার ব্যক্তি পাহাড় ধসে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করলে ইনশাআল্লাহ তিনি হাদিসে বর্ণিত শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন— এমন আশা করা যায়। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে শহীদ বলা যাবে না; কারণ চূড়ান্ত বিচার একমাত্র আল্লাহ তাআলার।
‘শহীদুল আখিরাহ’ বলতে কী বোঝায়?
ইমাম নববি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, হাদিসে উল্লিখিত এসব ব্যক্তি ‘শহীদুল আখিরাহ’। অর্থাৎ— আখিরাতে তারা শহীদের সওয়াব ও মর্যাদা লাভ করবেন। তবে দুনিয়ার বিধানের ক্ষেত্রে তাদের গোসল, কাফন ও জানাজা সাধারণ মুসলিমের মতোই সম্পন্ন হবে। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাতবরণকারী শহীদের দুনিয়াবি বিধানের অন্তর্ভুক্ত নন। এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিন বান্দাদের জন্য এক বিশেষ অনুগ্রহ।
বিপদের সময় মুমিনের করণীয়
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পড়লে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তারই কাছে ফিরে যাব। তাদের ওপরই তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫–১৫৭)
ইসলাম জীবন রক্ষারও নির্দেশ দেয়
শাহাদাতের মর্যাদা বর্ণনার পাশাপাশি ইসলাম জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৫)
এই আয়াত থেকে আলেমগণ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন যে, অকারণে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা বৈধ নয়। তাই—
* পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় অপ্রয়োজনীয় অবস্থান করা,
* অবৈধভাবে পাহাড় কেটে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ানো,
* সরকারি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা,
—এসব ইসলামের সতর্কতামূলক শিক্ষার পরিপন্থী।
রাঙামাটির ৯৭ স্থানে পাহাড়ধস, আশ্রয়কেন্দ্রে ৪১৬৬ মানুষ
পাহাড়ধসে দুই জেলায় ৭ জনের মৃত্যু