পৃথিবীর কক্ষপথে জার্মানির প্রথম বাণিজ্যিক রকেট

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

ইউরোপের মহাকাশ অভিযানে নতুন মাইলফলক তৈরি করেছে জার্মানির বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানি ইজার অ্যারোস্পেস। নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলের আন্দোয়া স্পেসপোর্ট থেকে উৎক্ষেপণের পর কোম্পানিটির স্পেকট্রাম রকেট সফলভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছেছে। এটিই  ইউরোপ থেকে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছানো প্রথম বাণিজ্যিক রকেট।

শনিবারের (৪ সেপ্টেম্বর) এই উৎক্ষেপণ ইউরোপের নিজস্ব মহাকাশে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি আকারের উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্রমবর্ধমান বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে ইউরোপের একাধিক দেশ ও প্রতিষ্ঠান এখন সক্রিয়ভাবে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

স্পেকট্রাম রকেটটি কোনো নভোচারী বহন করেনি। ইজার অ্যারোস্পেস জানিয়েছে, রকেটটিতে পাঁচটি ছোট উপগ্রহের পাশাপাশি একটি উড্ডয়নকালীন প্রযুক্তি পরীক্ষার সরঞ্জাম ছিল। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড্যানিয়েল মেটসলার বলেন, পুরো মহাকাশশিল্পে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হলো উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সক্ষমতা।

সফল এই উৎক্ষেপণ ইজারের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে ২০২৫ সালে একই উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে কোম্পানিটির প্রথম রকেট উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই সাগরে পড়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল। তবে সেই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এবার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাতেই পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছাল স্পেকট্রাম।

ইজার জানিয়েছে, তাদের আরও পাঁচটি রকেট নির্মাণাধীন রয়েছে। এখন উৎপাদন ও উৎক্ষেপণের পরিসর দ্রুত বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘমেয়াদে বছরে প্রায় ৪০টি রকেট উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস এই সাফল্যকে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশবিষয়ক কমিশনার আন্দ্রিয়ুস কুবিলিয়ুসও বলেছেন, ইউরোপের স্বাধীন মহাকাশে প্রবেশাধিকার এই সাফল্যের মাধ্যমে বড় ধরনের গতি পেয়েছে।

ইউরোপের মহাকাশে কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রশ্নটিও এই উৎক্ষেপণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের উপগ্রহ ও মহাকাশযান উৎক্ষেপণের সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। নরওয়ের আন্দোয়া, সুইডেনের এসরাঞ্জ এবং যুক্তরাজ্যের স্যাক্সাভর্ড স্পেসপোর্ট, সবগুলোই এই প্রচেষ্টার অংশ।

ইজার অ্যারোস্পেস একই সঙ্গে কানাডার নোভা স্কশিয়ায় দ্বিতীয় একটি উৎক্ষেপণকেন্দ্র নির্মাণ করছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সাল নাগাদ সেখান থেকে রকেট উৎক্ষেপণ শুরু হতে পারে।

বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণ বাজারে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স ও ফ্রান্সের আরিয়ানগ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য রয়েছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইউরোপের নিজস্ব বেসরকারি উৎক্ষেপণশিল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় ইজারের এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্প্রতি ইজার ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি ইউরো অর্থায়নও পেয়েছে। নতুন রকেট তৈরি, পরীক্ষা এবং উৎক্ষেপণ অবকাঠামো সম্প্রসারণে এই অর্থ ব্যবহার করবে প্রতিষ্ঠানটি।

নরওয়ের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী সিসিলি মিরসেথের মতে, অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে আন্দোয়া থেকে ইউরোপীয় উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সক্ষমতা নরওয়ে ও ইউরোপের নিরাপত্তাকেও শক্তিশালী করবে।

ফলে স্পেকট্রামের সফল উৎক্ষেপণ শুধু একটি বেসরকারি রকেটের কক্ষপথে পৌঁছানোর ঘটনা নয়; ইউরোপের নিজস্ব মহাকাশ সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণশিল্প গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। সূত্র: রয়টার্স

এএস
আরও পড়ুন